ক্লাসের সবচেয়ে চঞ্চল প্রকৃতির মেয়ে আলো। ক্লাসের প্রত্যেকটি মানুষকে সে তার কথার মাধ্যমে সর্বদা আনন্দে রাখে। একদিন ক্লাসে না এলেই পুরো ক্লাস রুমটা যেন প্রাণহীন হয়ে যায়। অপর দিকে হিমেল হলো ক্লাসের সবচেয়ে নিশ্চুপ কিন্তু মেধাবী ছেলে। বন্ধুর সঙ্গে একটু আধটু কথা বলে, সেটুকুও বলে নেহাত ক্লাসের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় বুঝে নেওয়ার জন্য। তার এই গুমটভাবে চলাফেরার কারণে অনেকেই তাকে পেছনে বিভিন্ন খারাপ মন্তব্য ছুড়ে দেয়। অন্যদিকে নিবিড় ক্লাসের রিপ্রেজেন্টেটিভের দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সঙ্গে পড়াশোনা, বিতর্ক, আবৃত্তি ও সামাজিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজেকে সর্বদা নিয়োজিত রাখে। পরিবার, আত্মীয়স্বজন, শিক্ষক ও বন্ধুমহলের কাছে তাই অনেক প্রিয় মানুষ সে।
ওপরের প্রত্যেকটি উদাহরণ কাল্পনিক চরিত্র, যারা একেক জন একেক ব্যক্তিত্বের অধিকারী। ব্যক্তিত্ব হলো চিরগতিশীল জৈবিক ও মানসিক সত্তা, যা একটি ব্যক্তির সামগ্রিক আচরণকে তুলে ধরে। একটি মানুষের ব্যক্তিত্ব বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। তার মধ্যে বিশ্বাস, মূল্যবোধ, মনোভাব, দৃষ্টিভঙ্গি, অভিজ্ঞতা, সামর্থ্য, আবেগ, আচার-আচরণ, আগ্রহ ও ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য।
ব্যক্তিত্ব শব্দটি ল্যাটিন শব্দ ‘পারসোনা’ (Persona) থেকে নেওয়া হয়েছে, যার শব্দের অর্থ হলো ‘মুখোশ’। বিভিন্ন মনোবিজ্ঞানী বিভিন্নভাবে ব্যক্তিত্বের সংজ্ঞা দিয়েছেন। মনোবিজ্ঞানী জি ডব্লিউ আলপোর্ট ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে বলেছেন, ‘ব্যক্তিত্ব হলো সেই মনোবৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াগুলোর স্বতন্ত্র গতিশীল সংস্থা, যা তার বৈশিষ্ট্যগুলোর আচরণ এবং চিন্তাভাবনাকে নির্ধারণ করে।’ অর্থাত্ ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিকে খুব সহজেই আলাদাভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়ে থাকে।
নিজের ব্যক্তিত্বের কিছু বৈশিষ্ট্যের উন্নতির মাধ্যমে মানুষ তার ব্যক্তিজীবন ও কর্মজীবন অনেক সুন্দর ও সাবলীলভাবে পরিচালনা করতে সক্ষম হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, জীবনে সামান্য কিছু ভুল উপস্থাপন, আচার-আচরণ এবং চিন্তাভাবনার কারণে অনেক কষ্টে অর্জিত সফলতাও মানুষের সামনে গ্রহণযোগ্যতা পায় না। বর্তমান সমাজব্যবস্থায় ঘটে যাওয়া নানা রকম অসংগতি ও অপরাধপ্রবণতা কমানোর জন্য ব্যক্তিত্বের সঠিক বিকাশ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার জন্য কিছু বিষয়ের ওপর সর্বদা খেয়াল রাখতে হবে।
পরিবার ও প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে থাকে।
প্রত্যেক পরিবারেই কতকগুলো নিয়ম, আদর্শ, মূল্যবোধ, বিশ্বাস, বিধিনিষেধের মধ্যে দিয়ে প্রতিটি মানুষকে বড় করে তোলে। তাই পরিবারের সঙ্গে সঙ্গে আত্মীয়স্বজনের চালচলন, শিষ্টাচার, পছন্দ-অপছন্দ আদান-প্রদানের মাধ্যমে সমাজের প্রত্যেকটি সামাজিকীকরণের বিষয়ে অবগত থাকার কারণে সমাজস্বীকৃত ব্যক্তিত্ব নিজের মধ্যে বিকাশ লাভ করবে।
ব্যক্তিগত জীবনধারার ওপরে ব্যক্তিত্ব অনেকাংশে নির্ভর করে। মানুষের সঙ্গে আলাপচারিতার মাধ্যমে নিজের জানার পরিধি বৃদ্ধি করতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে যে যত কোনো বিষয়ে পরিষ্কার জ্ঞান, ধ্যানধারণা রাখতে পারবে—সে ততটা সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে প্রত্যেকটি বিষয়কে তুলে ধরতে সক্ষম হবে। ব্যক্তিগতভাবে পোশাক নির্বাচন, হাঁটার ভঙ্গিমা, কথা বলার ভঙ্গিমাগুলো একজন মানুষের ব্যক্তিত্বকে অনেক বেশি প্রভাবিত করে থাকে। তাই এই বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত।
বর্তমান সমাজব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে অনেক সময় লক্ষ্য করা যায়, মানুষ নিজের প্রয়োজনের জন্য ব্যবহূত জিনিসপত্র ক্রয় না করে অন্যকে দেখানোর জন্য সামর্থ্যের বাইরে গিয়া নিজের মধ্যে মিথ্যা চাহিদা তৈরি করে। এসবের মাধ্যমেও মানুষ নিজের ব্যক্তিত্বকে হারিয়ে ফেলছে। অপরদিকে বিভিন্ন সামাজিক উত্সব ও কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মধ্যদিয়ে মানুষ নিজেকে ইতিবাচক মনোভাবের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা, অন্যের কুত্সা রটনা, অন্যকে হেয় প্রতিপন্ন করার মনমানসিকতা নিজের ব্যক্তিত্বকেই বিনষ্ট করে দেয়। তাই অন্যকে সম্মান প্রদর্শন করার মাধ্যমে, অন্যের কথা শোনার মন-মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। সমাজ, পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন এবং চ্যালেঞ্জিং সময় নেতৃত্ব দানের মাধ্যমেও ব্যক্তিত্বের বিকাশ লাভ করে। সবার বুঝতে হবে যোগাযোগ মাধ্যমের সামান্য একটি কমেন্টের মাধ্যমেও আপনি নিজের ব্যক্তিত্বকে প্রকাশ করছেন। প্রত্যেকে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে পারলেই সামাজিক মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে একটি সুন্দর জীবন কাটানো সম্ভব।
n লেখক :প্রভাষক (সোশিওলজি), বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়, তেজগাঁও, ঢাকা-১২০৮