জাতীয় সংসদের সাবেক ডেপুটি স্পিকার ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম অভিযুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব.) শওকত আলী আর নেই (ইন্না লিল্লাহি...রাজিউন)। ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ৯টায় তিনি ইন্তেকাল করেন বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের পরিচালক (গণসংযোগ) মো. তারিক মাহমুদ। মরহুম শওকত আলীর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। তিনি কিডনি, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, হূদেরাগ ও নিউমোনিয়ায় ভুগছিলেন। অবস্থার অবনতি হলে ২২ অক্টোবর তাকে সিএমএইচে ভর্তি করা হয়।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক
শওকত আলীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রপতি শোকবার্তায় বলেন, মরহুম শওকত আলী বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি অবিচল থেকে আজীবন স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে কাজ করে গেছেন। তিনি একজন সামরিক অফিসার হওয়া সত্ত্বেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য যে সাহসী ভূমিকা রেখেছেন, তা অতুলনীয়। প্রধানমন্ত্রী তার শোকবার্তায় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শওকত আলীকে ২৬ নম্বর আসামি করা এবং বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাবাস করার ঐতিহাসিক ঘটনাসমূহ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘দেশ এক প্রবীণ জননেতাকে হারাল, আমি হারালাম বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন বিশ্বস্ত সহকর্মীকে।’
স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার-চিফ হুইপের শোক :জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া এবং চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী পৃথক শোকবার্তায় গভীর শোক জানান এবং মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে শোকার্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
আরো যারা শোক জানান :শওকত আলীর মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম মান্নান শোক জানান। জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম শোকবার্তায় বলেন, ডেপুটি স্পিকার হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের অগ্রপথিকের ইন্তেকালে জেপি নেতৃত্বয় গভীর শোক জানিয়ে মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান।
এছাড়া শোক জানিয়েছেন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদের, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু। পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম, শরীয়তপুর-১ আসনের এমপি ইকবাল হোসেন ও শরীয়তপুর-৩ আসনের এমপি নাহিম রাজ্জাকও শোক জানিয়েছেন।
জানাজা ও দাফন :গতকাল বাদ মাগরিব বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে শওকত আলীর প্রথম জানাজা হয়। এর আগে বিকাল সাড়ে ৩টায় শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তার মরদেহ রাখা হয় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে। আজ মঙ্গলবার সকালে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে নড়িয়ার গ্রামের বাড়িতে। নড়িয়া শহিদ মিনার প্রাঙ্গণে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে জোহরের নমাজের পর নড়িয়া বি এল উচ্চবিদ্যালয়ে দ্বিতীয় দফায় জানাজা হবে। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে নিজ বাড়ি ‘স্বাধীনতা ভবন’-এর আঙিনায় দাফন করা হবে শওকত আলীকে।
সংক্ষিপ্ত জীবনী :শওকত আলী শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার লোনসিং বাহের দীঘিরপাড় গ্রামে ১৯৩৭ সালের ২৭ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি নেওয়ার পর ১৯৫৯ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন পান। পাকিস্তান আমলে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হয়েছিল, তাতে শওকত আলীকে ২৬ নম্বর আসামি করা হয়। ১৯৬৮ সালের ১০ জানুয়ারি ক্যাপ্টেন পদে থাকা অবস্থায় পশ্চিম পাকিস্তানে ক্যান্টনমেন্ট থেকে আটক করার পর ঐ মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। শওকত আলী ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। স্বাধীনতার পর আবার সেনাবাহিনীতে ফেরেন।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর শওকত আলীকে সেনাবাহিনী থেকে অবসরে পাঠানো হয়। পরে ’৭৭ সালে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং ১৯৭৯ সালে শরীয়তপুর-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সেবার আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের হুইপের দায়িত্ব পান তিনি। একই আসন থেকে এরপর আরো পাঁচ বার এমপি হন তিনি। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ নবম সংসদে যখন স্পিকার ছিলেন, তখন শওকত আলী ছিলেন ডেপুটি স্পিকার। দশম সংসদে তাকে সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শওকত আলী ৭১ ফাউন্ডেশনের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বে ছিলেন।