ছেলেটির বয়স যখন আট বছর, মাউন্ট এভারেস্টের ছবি দেখিয়ে তার বাবা বলেছিলেন, এর চূড়ায় উঠতে পারবে তুমি? ছেলেটি বুঝে হোক আর না বুঝে হোক, বলেছিল আমি পারব। স্কুল জীবন শেষে ব্রিটিশ আর্মির এয়ার ডিভিশনে যোগ দেয় ছেলেটি। মনের ভেতর হিমালয়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে দাঁড়িয়ে বিজয়ীর চিত্কার দেওয়ার ইচ্ছে তখনো দমে যায়নি। এর ভেতর একদিন ঘটে গেল দুর্ঘটনা। জাম্বিয়াতে ফ্রি ফল প্যারাশুটিং করার সময় মারাত্মক আঘাত পায় সে। শিরদাঁড়ার তিনটা কশেরুকা ভেঙে যায় তার। ডাক্তার জানিয়ে দেয়, জীবনে সে আর হাঁটতে পারবে না কোনো দিন। হুইল চেয়ারে কাটিয়ে দিতে হবে বাকিটা জীবন। আর্মির চাকরি চলে যায়। সামনে বাকিটা জীবন পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে কাটিয়ে দেওয়ার প্রতীক্ষা। শুধু অদম্য ইচ্ছাশক্তি থেকে ছেলেটা এক বছরের ভেতর হুইল চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। হাঁটতে শুরু করল। এরপর শুরু করল দৌড়াতে। ডাক্তারদের সব ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যে প্রমাণ করে দিল ছেলেটি। উঠে দাঁড়ানোর ঠিক ছয় মাসের মাথায় ছেলেটি মাউন্ট এভারেস্ট জয় করে। তখন তার বয়স মাত্র ২৩ বছর। ছেলেটাকে আমরা সবাই চিনি, ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড অনুষ্ঠানের সুবাদে। তার নাম বিয়ার গ্রিলস। সে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, সে ফ অদম্য ইচ্ছাশক্তিই যথেষ্ট আবারও জীবনে ঘুরে দাঁড়াবার জন্য।
ইচ্ছাশক্তি ও সঠিক সিদ্ধান্তের আরো একটি গোষ্ঠীবদ্ধ উদাহরণ বর্তমানের উন্নত ইউরোপ। ১৬৪৮ সালের পূর্বে নিজেদের মধ্যে প্রায় ৩০ বছর ধরে আঞ্চলিক যুদ্ধে লিপ্ত ছিল ইউরোপের দেশগুলো। এই যুদ্ধে প্রায় ৮০ লাখ সামরিক ও বেসমারিক লোক হতাহত হয়। যুদ্ধরত দেশগুলোর মধ্যে শুভবোধ জাগ্রত হলে তারা নিজেদের মধ্যে শান্তিচুক্তির সিদ্ধান্ত নেয়। ২ অক্টোবর ১৬৪৮ সাল। দিনটি ইউরোপীয়দের কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয়। ওয়েস্টফেলিয়ার শান্তি চুক্তির মাধ্যমে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটে এই দিনে। এরপর কিন্তু ইউরোপীয়রা সময় নষ্ট না করে নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নে উত্তাল সমুদ্রপথ ও দুর্গম বনজঙ্গল পাড়ি দিয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। নানা প্রতিকূলতাকে অগ্রাহ্য করে বিশ্বময় গড়ে তুলেছিল নিজেদের উপনিবেশ। উপনিবেশগুলো থেকে আহরিত সম্পদ তারা শুধু নিজেদের ভোগবিলাসে কাজে লাগায়নি, গবেষণা ও জ্ঞানবিজ্ঞানের উন্নয়নেও ব্যয় করেছে। সূচনা করেছে শিল্পবিপ্লবের। ফলে তারা হয়েছে তস্কর থেকে উন্নত ও সভ্য জাতি। শীতের দেশে অভ্যস্ত গৌর বর্ণের ইউরোপীয়রা প্রয়োজনের তাগিদে নিজেদের ইচ্ছাশক্তিকে শানিত করে ছড়িয়ে পড়ে মরুভূমি থেকে শুরু করে অনুন্নত আফ্রিকার মানুষখেকো জনগোষ্ঠীর মধ্যে। আজ আমরা তাদেরকে উন্নত জাতি হিসেবে দেখছি তাদের ত্যাগ, নির্ভীকতা, ইচ্ছাশক্তি ও সঠিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কারণে।
ইতিবাচক ইচ্ছাশক্তি জাতিকে সফলতার চরম সীমায় উন্নীত করতে পারে; কিন্তু নেতিবাচক ইচ্ছাশক্তি দেশের সর্বনাশের জন্য দায়ী। দুর্নীতির মাধ্যমে অযোগ্য লোকের নিয়োগ, অর্থ আত্মসাত্ দেশকে শুধু দরিদ্রই করে না, জনগোষ্ঠীর অন্তর্নিহিত ইচ্ছাশক্তি পরস্ফুিটনে বাধা সৃষ্টি করে। দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজে মানুষ চিন্তা করে, এত পরিশ্রম করে লাভ কী? চুরি করে বা দুর্নীতি করে তো ভালোই থাকা যায়! এমন জীবনদর্শনের কারণে সমগ্র জাতি নিজের যোগ্যতা বৃদ্ধিতে নিশ্চেষ্ট হয়ে পড়ে। শুরু হয় পরীক্ষার প্রশ্ন বিক্রি, অবৈধ উপায়ে ভর্তি ও নিয়োগ-বাণিজ্যের মতো বাণিজ্য। তাই ‘দুর্নীতি রোধ’ হোক জাতির সঠিক সিদ্ধান্তের প্রতিফলন।
পত্রপত্রিকায় প্রায়ই খবরের শিরোনাম হয় দালালের মাধ্যমে অবৈধ পথে পাড়ি দেওয়া তরুণ প্রজন্মের কথা। ইউরোপের কোনো জঙ্গলে হয়তো তারা আটকে পড়েছে অথবা ভূমধ্য সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে নৌকাডুবিতে জীবন হারিয়েছে। আমরা সবাই জানি, জীবন-জীবিকার স্বপ্নে বিভোর এই তরুণ প্রজন্ম পিতা-মাতার ভিটামাটি বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ দালালের হাতে তুলে দিয়ে শুরু করে এই অনিশ্চয়তার পথে যাত্রা; কিন্তু সঠিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মাধ্যমে সার্বজনীন বৈশ্বিক নাগরিক গড়তে পারলে বৈধ পথেই বিনা খরচে প্রবাসে জীবন-জীবিকার টেকসই ব্যবস্থা করা সম্ভব।
জাতি গড়তে জ্ঞানের চর্চায় এগিয়ে থাকার কোনো বিকল্প নেই। একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, অঙ্ক অলিম্পিয়াডে যারা ভালো করে তাদেরকে অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, হার্ভার্ডের মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজের প্রতিষ্ঠানে নেওয়ার জন্য কাড়াকাড়ি শুরু করে। এতে এটাই প্রমাণিত হয় যে, গবেষণা ও পৃথিবীর প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মূলে রয়েছে অঙ্ক। তাছাড়া চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চালিকাশক্তি দক্ষ ও প্রত্যয়ী ‘কম্পিউটার প্রোগ্রামার’ তৈরিতে অঙ্কতে পারদর্শিতা অপরিহার্য। খবরে পড়লাম যশোর হাইটেক পার্ক ছেড়েছে ১৭টি প্রতিষ্ঠান। বিনিয়োগকারীরা বলছেন সেখানে একটি বড় সমস্যা দক্ষ জনবল পাওয়া। আমার মতে সারা বাংলাদেশেই কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ে দক্ষ জনবল পাওয়া বেশ কঠিন। এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হলে অঙ্ক শিক্ষায় দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। কীভাবে করতে হবে? শুধু পাশ্চাত্যের অনুকরণ নয় বাস্তবিক বিশ্লেষণে যে জাতি অঙ্কে পারদর্শী তার অঙ্ক শেখানোর কৌশল গ্রহণ করতে হবে।
বর্তমান সময়ে আমেরিকা জ্ঞানবিজ্ঞান ও অর্থের দৌড়ে পৃথিবী সেরা। একটি বিষয় জানলে অবাক হবেন, এমন একটি দেশের অভিভাবকগণ ছেলেমেয়েদেরকে রুশ পদ্ধতিতে অঙ্ক শেখানোর জন্য রুশ অঙ্ক স্কুলে পাঠান। বর্তমানে আমেরিকাতে এই স্কুলের ৪০টি শাখা আছে যার ১৫টির ম্যাসেচুয়েটস শহরে অবস্থিত। বর্তমানে এর ছাত্রসংখ্যা ২২ হাজার। বিশ্বের সর্ববৃহত্ অর্থনীতির দেশ হয়েও রাশিয়ান অঙ্কের নির্যাসটুকু গ্রহণ করতে আমেরিকানরা কিন্তু একটুও কার্পণ্য করছেন না বরং এর সপক্ষে এমআইটির অনেক অধ্যাপক পক্ষপাতহীন যুক্তি দিয়েছেন। হার্ভার্ড ও এমআইটির অ্যামিরেটাস অধ্যাপক লরেন গ্রাহাম বলেন, ‘অঙ্কের ক্ষেত্রে রাশিয়ানদের গৌরোজ্জ্বল ঐতিহ্য রয়েছে।’ রাশিয়ান অঙ্ক শিখন পদ্ধতি অনুসরণের সপক্ষে এমআইটির অঙ্ক বিষয়ের ইতিহাসবিদ স্লাভাগেরোভিচ বলেন, ‘এরকম কিছু নয় যে রাশিয়ানদের অঙ্ক শেখার জন্য বিশেষ কোনো জীনগত বৈশিষ্ট্য রয়েছে; কিন্তু আমি মনে করি, সোভিয়েত স্কুলগুলোতে এমন কিছু পদ্ধতিগত বিষয় আছে যা বাচ্চাদের অঙ্ক শেখাকে সহজ ও এর ভিত্তিকে মজবুত করে।’ শিক্ষক হিসেবে খেয়াল করছি দিন যত যাচ্ছে অঙ্কসহ বিজ্ঞানের মূল বিষয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের ভয় ও অনীহা বাড়ছে। তাই গবেষণামনস্ক জাতি, কারিগরি শিক্ষার উন্নয়ন কিংবা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দক্ষ জনবল—যেটাই তৈরির কথা বলি না কেন? তা বিশ্বমানের হবে যদি বিজ্ঞানের মূল বিষয়গুলোতে পারদর্শিতা থাকে। এ বিষয়ে আমাদের থাকতে হবে আমেরিকানদের মতো উদার দৃষ্টিভঙ্গি। প্রয়োজনে নিজের শত্রুরও ভালোটা গ্রহণ করব আবার মিত্রেরও মন্দটি বর্জন করব। তবেই গড়ে উঠবে উন্নত স্বনির্ভর জাতি।
n লেখক :অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর-১৭০৭