চিরনিদ্রায় শায়িত প্রধানমন্ত্রীর চাচি শেখ রাজিয়া নাসের

অসংখ্য মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে বনানী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদ শেখ আবু নাসেরের স্ত্রী শেখ রাজিয়া নাসের। সেখানে শায়িত আছেন স্বামীসহ জাতির পিতার পরিবারের ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের অন্য শহিদেরা। গতকাল মঙ্গলবার বাদ জোহর বনানী কবরস্থানে জানাজা শেষে সেখানেই শেখ রাজিয়া নাসেরকে দাফন করা হয়। তিনি সোমবার রাত ৮টা ৫০ মিনিটে রাজধানীর এভার কেয়ার হাসপাতালে বার্ধ্যকজনিত কারণে মারা যান (ইন্না লিল্লাহি...রাজিউন)। গত ৩ নভেম্বর থেকে তিনি ঐ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ছিলেন।

গতকাল বাদ জোহর বনানী কবরস্থানের সামনে শেখ রাজিয়া নাসেরের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় তার পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন ছাড়াও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। জানাজা শেষে        শেখ রাজিয়া নাসেরের মরদেহের কফিনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এস এম শামীম উজ জামান। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল নকিব আহমেদ চৌধুরী শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে উপস্থিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তার কফিনে শ্রদ্ধা জানান। আওয়ামী লীগের পক্ষে সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় নেতারা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, আব্দুল মতিন খসরু, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হক, দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, কেন্দ্রীয় সদস্য শাহাবুদ্দিন ফরাজী, আনোয়ার হোসেন প্রমুখ। আওয়ামী লীগের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর একে একে খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দক্ষিণ, আওয়ামী যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া শ্রদ্ধা জানান। এরপর যশোর জেলা আওয়ামী লীগ, খুলনা জেলা, মহানগর আওয়ামী লীগ, বাগেরহাট জেলা আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। মরহুমার পরিবারের পক্ষ থেকে তার বড় ছেলে শেখ হেলাল উদ্দিন তার আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করে সবার কাছে দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করেন। জানাজায় ইমামতি করেন মুফতি রুহুল আমিন। জানাজার প্যান্ডেল পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন। এ সময় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে জানাজায় আরো অংশ নেন মরহুমার ছেলে শেখ সালাউদ্দিন জুয়েল, শেখ সোহেল, শেখ রুবেল, শেখ বাবু, শেখ তন্ময় প্রমুখ। এছাড়া আত্মীয়স্বজনের মধ্যে  ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, শেখ ফজলে শামস পরশ, শেখ ফজলে ফাহিম, শেখ ফজলে নাঈম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্ব্বরের বাসায় বিপথগামী কিছু সেনাসদস্যের নারকীয় হামলায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের বাকি সদস্যের সঙ্গে নিহত হন শেখ আবু নাসের। তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন রাজিয়া নাসের। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি আর্মিরা শেখ আবু নাসেরের টুঙ্গিপাড়ার বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। পরে সন্তানদের নিয়ে ঢেঁকিঘরে আশ্রয় নেন শেখ রাজিয়া নাসের। রাজাকাররা জানতে পারে যে শেখ নাসেরের পরিবার ঢেঁকি ঘরে আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে গিয়ে তারা সেটিও পুড়িয়ে দেয়। শেখ আবু নাসের ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ছেলে শেখ হেলাল ও ভাতিজা শেখ জামাল শেখ নাসেরের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে মেজর জলিলের নেতৃত্বাধীন ৯ নম্বর সেক্টরে ছিলেন। শেখ হেলাল ও শেখ জামাল ছোট থাকার কারণে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গোলাবারুদ সরবরাহ করতেন, মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য দিতেন এবং তাদের অস্ত্রের গুলি লোড করে দিতে সাহায্য করতেন। যুদ্ধের একপর্যায়ে শেখ নাসের ভারতে চলে যান। সেখানে ট্রেনিং নিয়ে ফিরে এসে সুন্দরবন এলাকায় সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নেন।

পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পরে খুনিরা শেখ নাসেরকেও হত্যা করে। পরের দিন ১৬ আগস্ট যখন টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতাকে দাফন করা হয়, শেখ রাজিয়া নাসের সন্তানদের নিয়ে নিজেদের লঞ্চে করে খুলনা থেকে টুঙ্গিপাড়ায় আসেন। কিন্তু খুনি চক্র টুঙ্গিপাড়ায় সেই লঞ্চ ভিড়তে দেয়নি। পরে সন্তানদের নিয়ে লঞ্চে করে আবার খুলনায় ফিরে যান। বাড়িতে ফিরে এসে দেখেন খুনি সরকার তার বাড়ি সিলগালা করে রেখেছে। নিজের বাড়িতেও শত চেষ্টা করে ঢুকতে পারেননি। একপর্যায়ে সন্তানদের নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন। পরে সন্তানদের নিয়ে রাতে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন। তখন শেখ রাজিয়া নাসের প্রায় সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। বাবার বাড়িতেও খুনিরা তাকে থাকতে দেয়নি। তার বাবার ওপর নানা প্রেশার দিতে থাকে বঙ্গবন্ধুর খুনি চক্র। একপর্যায় সেখানে টিকতে না পেরে পাবনায় দাদার বাড়িতে চলে যান রাজিয়া নাসের। কিন্তু সেখানেও বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হন ছেলেমেয়েদের নিয়ে। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা হয় না। স্কুলে ভর্তি নেওয়া হয়নি। তখন বড় ছেলে শেখ হেলাল ক্যাডেট কলেজে পড়তেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ক্যাডেট কলেজে একটা গ্রুপ হানা দেয় শেখ হেলালকে তুলে নেওয়ার জন্য। কিন্তু শিক্ষক ও ছাত্রদের, বিশেষ করে ক্যাডেট কলেজের সেই সময়কার প্রিন্সিপালের বাধার মুখে শেখ হেলাল রক্ষা পান।

শেখ রাজিয়া নাসের সন্তানদের নিয়ে আবার খুলনায় ফিরে আসেন। এখানে-সেখানে মানবেতর জীবন যাপন করতে থাকেন সাত সন্তান নিয়ে। বড় মেয়ে মিনা ও ছেলে শেখ জুয়েলকে খুলনা সরকারি স্কুলে ভর্তি করানো হলেও জিয়া সরকারের নির্দেশে স্কুল থেকে তার সন্তানদের নাম কেটে দেয়। সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। তাদের পারিবারিক ব্যবসাও বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে সাত সন্তান নিয়ে নিদারুণ অর্থকষ্টে পড়েন শেখ রাজিয়া নাসের। অবশেষে ১৯৮১ সালে তার বাড়ির সিলগালা খুলে দেওয়া হয়। পরে তিনি সন্তানদের নিয়ে সেখানে ওঠেন। ইতিমধ্যে ছেলে শেখ হেলাল ক্যাডেট কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

শেখ রাজিয়া নাসের অত্যন্ত প্রগতিশীল ও সংস্কৃতিমনা ছিলেন। এই মহীয়সী নারীর ১৯৫৭ সালে বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ আবু নাসেরের সঙ্গে বিয়ে হয়। শেখ রাজিয়া নাসেরের বড় ছেলে বাগেরহাট-১ আসনের এমপি শেখ হেলালউদ্দিন ও খুলনা-২ আসনের এমপি শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল। তার নাতি ও শেখ হেলালের ছেলে শেখ শারহান নাসের তন্ময় বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার চাচি রাজিয়া নাসের। ১৯৭৭ সালে বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানা লন্ডন থেকে বেবিসিটারের কাজ করে জমানো টাকা দিয়ে তার চাচি ও ভাইবোনদের জন্য শীতের কাপড়সহ প্রথম সহায়তা পাঠান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন ভারতের দিল্লিতে ছিলেন। এরপর তিনি সেখান থেকে তার চাচিসহ ভাইবোনদের জন্য সহায়তা পাঠিয়েছিলেন। ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর তার চাচি রাজিয়া নাসের তাকে মাতৃস্নেহে আগলে রাখেন। তিনি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অভিভাবক।

শেখ রাজিয়া নাসেরের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, কেন্দ্রীয় ১৪ দলের সমন্বয়ক ও মুখপাত্র আমির হোসেন আমু এমপি। এক শোকবার্তায় আমির হোসেন আমু  মরহুমার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। শেখ রাজিয়া নাসেরের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি এবং দলের সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম। এক শোকবার্তায় জেপি নেতৃদ্বয় বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ আবু নাসেরের শাহাদত বরণের পর তিনি যেভাবে ধৈর্য ও সাহসিকতার সঙ্গে সাত নাবালক-নাবালিকাকে লালন-পালন এবং   পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন তা  প্রসংশার দাবি রাখে। নেতৃদ্বয় মরহুমার রুহের মাগফিরাত কামনা করেন       এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান।