আজ লিখতে বসেছি প্রত্যক্ষ করা একই ধরনের আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে তিন দেশে তিন রকমের ব্যবস্থা সম্পর্কে। আইনের বিধান প্রায় একই হলেও প্রয়োগের ভিন্নতা বিচিত্র। তিনটি দেশ হলো বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া এবং ব্রুনাই। আসলে তিন দেশের বাসিন্দা হিসেবে আমাকে মেনে নিতে হয়। অপার সম্ভাবনা আর জন্মগতভাবে ভালোবাসার দেশ বাংলাদেশ। নিজেকে স্বচ্ছ অর্থে সাফল্য আর পরিবারের সবার দৃশ্যত নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য দক্ষ প্রবাসী হিসেবে আবেদনের মাধ্যমে পাওয়া নাগরিকত্বের দেশ অস্ট্রেলিয়া। সবশেষে অঢেল পেট্রোলিয়াম আর খনিজ সম্পদ আর সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদে পরিপূর্ণ রহস্যময় দেশ ব্রুনাই। এই দেশটির প্রতি একটি আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল আশির দশকের গোড়ার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায়। শান্তিপূর্ণভাবে ব্রিটিশ কলোনি মুক্ত হওয়া দেশের চমকপ্রদ খবর পড়ে মনের কোনে এক ধরনের ভালোবাসা জন্মে ছিল সেই তখন থেকেই। অবশ্য তখন সেটি ছিল সম্পূর্ণ অবাস্তব কল্পনা। অনেকটা উঠতি বয়সে সিনেমার নায়িকাকে ভালোবাসার মতো। কোনো দিন ব্রুনাই আসব তা হিসাবে মিলাতে পারিনি।
তিন দেশের তিনটি ঘটনার সারসংক্ষেপ :বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা। সপরিবারে ছুটি কাটাতে দেশে গিয়েছি। দুই সপ্তাহের ছুটির সময়গুলো যাতে সঠিকভাবে কাটানো যায়, সে জন্য একটি ভালো গাড়ি ঠিক রাখা ছিল। সেই গাড়িতে জামালপুর, ময়মনসিংহ ঘুরে ঢাকায় দেখা সাক্ষাত্ করা, বাজার করা সবই হচ্ছিল। বিপত্তি ঘটল এক দিন সকালে উত্তরা ১০ নম্ব্বর সেক্টর থেকে ৪ নম্ব্বর সেক্টরে যাওয়ার সময় একজন ট্রাফিক সার্জেন্ট গাড়ি থামালেন। ড্রাইভার বাইরে গিয়ে সার্জেন্টের সঙ্গে অনেকটা সময় ধরে কথা বলার পরও ফেরত আসছিল না দেখে আমি নেমে গেলাম। ট্রাফিক সার্জেন্ট আমাকে বললেন, ভাই আপনাকে অন্য গাড়ি ভাড়া করে যেতে হবে কারণ আমরা এই গাড়ি থানায় নিয়ে যাব। কারণ জিগ্যেস করতেই বললেন যে, দেখেন এই গাড়ি এখনো Rego নম্ব্বর পায় নাই। আবেদন করেছে এবং ONTEST sign দিয়ে চালাচ্ছে। বিষয়টি গত কয়দিনে আমাদের নজরেই আসেনি। আমি সার্জেন্ট সাহেবকে বললাম যে, ONTEST sign দিয়ে চালানো বেআইনি হলে এই গাড়িটি গত কয়েক মাস যাবত্ রাস্তায় চলছে কি করে? সার্জেন্ট সাহেব আমাকে বললেন ভাই আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে বিদেশে থাকেন। আপনি যে দেশে থাকেন সেখানে কি ONTEST sign লাগিয়ে গাড়ি রাস্তায় চলে? বললাম, না। তবে গাড়ি কিনে এক দিনের মধ্যেই রেজিস্ট্রেশন ট্রান্সফার করা হয়ে যায়। তাই সমস্যা হয় না। আমি অস্ট্রেলিয়াতে থাকি। সেখানে ONTEST sign লাগিয়ে কেউ গাড়ি রাস্তায় নামানোর কথা চিন্তাও করবে না। আইনটি যদি বাংলাদেশেও হয়, তাহলে এর প্রয়োগ নেই কেন? সার্জেন্ট নাছোড়বান্দা। গাড়ি থানায় নিয়ে যাবে। আমি পড়ে গেলাম বিপদে। ৯ সিটের গাড়ি ভর্তি ছোট বাচ্চাসহ লাভলী এবং আমাদের কিছু আত্মীয়। ড্রাইভারকে জিগ্যেস করলাম কেন সে এইভাবে বেআইনি sign দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে? ড্রাইভারের জবাব পরিষ্কার, স্যার গাড়ির Rego নম্ব্বর পেতে অনেক দেরি হয়, সেজন্য নতুন বা প্রায় নতুন ভালো গাড়ি রোড পারমিট নিয়ে অনেকেই চালায়। আমি সার্জেন্ট সাহেবকে বললাম আমি এ ব্যাপারে এখন confused, তাই নিশ্চিত হওয়ার জন্য পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমার এক বন্ধু এবং আর একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাইকে ফোন করার কথা বলে মোবাইল ফোনটি হাতে নিয়েছি। তাদের নাম শুনতেই সার্জেন্ট সাহেবের সুর সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে গেল। আমাকে ফোনটি না করার জন্য বারবার অনুরোধ করলেন। তারপর বললেন sir ঠিক আছে, আপনি তো দুদিন পরে চলেই যাবেন। অসুবিধা নাই। এই গাড়ি নিয়েই চলতে থাকেন। আমি তখন তাকে বললাম আইন যদি ভঙ্গ করে থাকে ড্রাইভার তাহলে তাকে এভাবে ছাড়বেন কেন। সার্জেন্ট সাহেব সালাম দিয়ে বিদায় হলেন।
ঘটনা ২, ব্রুনাই :সম্প্রতি কোনো এক সন্ধ্যায় ত্রুস থেকে ফিরছি। সম্ভবত ক্লান্তির কারণে গাড়ির হেড লাইট অন করতে ভুলে গেছি। একটি সিগন্যালে পুলিশ আমাকে ইশারা করে কি যেন বলছিল। গাড়ি স্লো করে কাছে যেতেই বলল ‘প্লিজ টার্ন অন হেড লাইট’। আমিও ধন্যবাদ দিয়ে, হেড লাইট অন করে চলতে থাকলাম আর ভাবলাম এই ঘটনাটি সিডনিতে ঘটলে আমাকে অন্তত ৩০০ ডলার ফাইন গুনতে হতো আর তিনটি ডিমেরিট পয়েন্ট হারাতে হতো। আসলে ব্রুনাইয়ের রোড রুলস বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি মজার বিষয় হলো, এখানে মানুষ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, খুব কম মানুষই ইচ্ছে করে আইন অমান্য করে। মানুষ খুবই ধৈর্যশীল। রাস্তার মাঝখানে গাড়ির গতি কমিয়ে দিলেও হর্ন বাজাবে না পিছন থেকে। ধরে নেবে নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা হয়েছে। যে কারণে আমার হেড লাইট অন না করার বিষয়টি পুলিশ ধরে নিয়েছে যে এটি একটি অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি। তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রেই প্রথম অপরাধের জন্য সাধারণত মৌখিকভাবে সতর্ক করে।
ঘটনা ৩, সিডনি, অস্ট্রেলিয়া :দুই বছর আগের ঘটনা। ব্রুনাই থেকে মেলবোর্ন এয়ারপোর্টে ট্রানজিট হয়ে সিডনিতে পৌঁছেছি সকাল ৯টার দিকে। ছেলে প্রসা এয়ারপোর্টে রিসিভ করেছে। প্রতিবারের মতো এবারেও এককাপ কফি, একটি টোস্ট, বাটার আমার জন্য গাড়িতে রাখা। ভ্রমণের ক্লান্তি দূর করার প্রশংসনীয় একটি উপায়। যাই হোক গাড়িতে উঠার পর প্রসা বলল ওকে university (UNSW ) তে যেতে হবে। ক্লাস আছে। যথারীতি uni তে নেমে যাওয়ার পর আমি ড্রাইভ করছিলাম। কোনো এক পর্যায়ে হয়তো ভুলেই গিয়েছিলাম আমি সিডনির রাস্তায় না ব্রুনাইতে। M4 এ পিছন থেকে সিগন্যাল দিয়ে পুলিশ থামাল। যথারীতি অস্ট্রেলিয়ান পুলিশের নিয়ম অনুযায়ী লাইসেন্স নিয়ে ৩৫০ ডলার ফাইন লিখে এবং তিনটি ডিমেরিট পয়েন্ট দিয়ে নোটিশ ধরিয়ে দিল। কারণ আমি অনেক বেশি স্পিড করছিলাম। মনটা খারাপ হয়ে গেল। রাতে লাভলী, প্রসা আর এশা (আমাদের মেয়ে)কে ঘটনা বলতেই সমস্বরে তিন জন বলে উঠল ‘এটি তোমার ব্রুনাই না। সিডনিতে তোমার গাড়ি চালানো বন্ধ।’
আমার জীবনে ঘটে যাওয়া এই তিনটি ঘটনা প্রমাণ করে তিন দেশের আইন প্রয়োগের সংস্কৃতি।
১. আইন আছে, তবে সবার জন্য প্রযোজ্য নয়, অন্তত কিছু ক্ষেত্রে তো নয়-ই। অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়া কঠিন কিছু নয়। সাধারণ জনগণ, প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এবং কর্তা ব্যক্তিরা নিজেদের মতো করে আইনের ব্যবহার করতে পারে। তবে সাম্প্রতিক কালে বর্তমান সরকারের গৃহীত শক্ত এবং তড়িত্ পদক্ষেপ হয়তো আইন মানার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবে ভবিষ্যতে। ২. মানুষ এবং আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান যদি আইন মানার সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে তবে আইন অমান্য করা সবাইর জন্য প্রায় অসম্ভব হতে পারে। মোদ্দা কথা হলো আইন প্রণয়নের চেয়ে চলমান আইনের প্রয়োগ এবং প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের, কর্তা ব্যক্তিদের সেই সঙ্গে সাধারণ জনগণকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তোলা বেশি জরুরি।
n লেখক :সিইও, জানিম ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন (ব্রুনাই হেলথ ফুডস) ব্রুনাই