শ্রদ্ধাঞ্জলি

কবি সুফিয়া কামাল :কিছু স্মৃতি, কিছু কথা

কবি সুফিয়া কামালকে স্মরণ করলে আমার সামনে চলে আসে বর্বর পাকিস্তানি সৈন্যদের অমানবিক, ভয়ংকর আর নির্মম অত্যাচার ও নির্যাতিত মেয়েদের পাশে এসে দাঁড়ানো এক সাহসিকা জননীর কথা। তার নেতৃত্বে ও প্রিন্সিপাল বদরুননেসা আহমেদের সহযোগিতায় একাত্তরের নির্যাতিত মুক্তিযোদ্ধা নারীদের উদ্ধার, আশ্রয়, সেবা ও পুনর্বাসনের মতো কঠিন কাজ করার প্রেরণা ও সাহস পেয়েছিলাম। কবি সুফিয়া কামালকে পেয়েছিলাম মাথার ওপর বটবৃক্ষের মতো শক্তিশালী একজন অসাধারণ মানুষ হিসেবে। তাকে ছোটবেলা থেকেই ‘খালাম্মা’ বলে সম্বোধন করে এসেছি। এই খালাম্মার অনুপ্রেরণা কঠিন কাজেও আমাদের সাহস যুগিয়েছে। তার বেশভূষা ছিল অতি সাধারণ। আর ব্যক্তিত্ব ছিল অসাধারণ। দেখা হলেই চরণযুগল ছুঁয়ে আশীর্বাদ নিতে কখনো দেরি হতো না। তারপর দুই হাতে মুখটা ধরে মাথায় চুমু খেতেন। মনে হয় এখনো তার হাতের পরশ লেগে আছে। আর সে পরশ আমাদের পথ চলার শক্তি হয়ে আছে।

একাত্তরে বর্বর পাকসেনারা ২ লাখ মা-বোনের ওপর নির্যাতন চালায়। অস্ট্রেলিয়ান শৈল্যচিকিত্সক ডা. জিউফ্রে ডেভিস বলেছেন, নির্যাতনের সংখ্যা ৪ লাখ হতে পারে। সেই নির্যাতিত মা-বোনের পাশে এসে দাঁড়ালেন কবি সুফিয়া কামাল জননী সাহসিকা। আর এই কাজে প্রথম স্বেচ্ছাসেবী কর্মী হিসেবে তার ডাকে কাজ শুরু করা। তারপর ‘কেন্দ্রীয় মহিলা পুনর্বাসন সংস্থার’ পরিচালক হিসেবে সার্বিক দায়িত্ব নিয়ে কাজ করা। সংস্থার সভাপতি ছিলেন কবি সুফিয়া কামাল আর সহসভাপতি ছিলেন প্রিন্সিপাল বদরুননেসা আহমেদ। বদরুননেসা আহমেদ ছিলেন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সহযোগী। তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রতিমন্ত্রী। কবি সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে কাজ করেছেন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকসেনাদের হাতে নির্যাতিত মা-বোনদের পুনর্বাসনের মতো দুরূহ কাজ। কবি সুফিয়া কামালের কথা স্মরণ করতে গেলে একাত্তরের নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসনের কথা উল্লেখ করতেই হবে। মেয়েদের মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, ‘তোদের পাশে আমরা আছি।’ এই অভয় বাণী শোনাবার লোকের অভাব দারুণভাবে অনুভব করি। ছোটখাটো শান্ত চেহারার এক নারীর মধ্যে ছিল এক অসাধারণ শক্তির ভান্ডার। তার সঙ্গে থেকে, কাছে থেকে সেই শক্তির জোরেই আমরা কাজ করেছি। শান্ত কণ্ঠে বলতেন কথা; কিন্তু তার কথায় ছিল বজ্রকঠিন নির্দেশ। তাইতো নির্যাতিত মা-বোনদের ‘মুক্তিযোদ্ধার’ সম্মান দেওয়ার দাবি তুলতে পেরেছিলাম নির্ভয়ে। খালাম্মার আশ্বাসের বাণী, সান্ত্বনার কথা, স্নেহের-আদরের কথা কখনো ভুলবার নয়। যদিও ৭২ সাল থেকেই আমার দাবি ছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকসেনাদের হাতে নির্যাতিত নারীদের মুক্তিযোদ্ধার সম্মান দেওয়ার। শেষ পর্যন্ত আমাদের দাবি মেনে বঙ্গবন্ধুর যোগ্যকন্যা শেখ হাসিনা তাদের ‘মুক্তিযোদ্ধার সম্মান দিয়েছেন। সেজন্য আমরা দেশনেত্রী শেখ হাসিনার কাছে কৃতজ্ঞ। সারা দেশের উপজেলাগুলোতে নারীদের খুঁজে খুঁজে তালিকা তৈরি করেছে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়। তারা প্রতি মাসে ভাতা পায়। তারা তাদের ত্যাগের সম্মান দেরিতে হলেও পেয়েছেন। এখনো যাদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে তাদের সম্মান জানানো হচ্ছে। আমাদের অভিবাদন তাদের প্রতি।

নভেম্বর মাসের ২০ তারিখে কবি চলে গেছেন না ফেরার দেশে; কিন্তু তার কথা, তার স্মৃতি রয়ে গেছে মানুষের অন্তরে অন্তরে। চিরদিন সে স্মৃতি থাকবে অমলিন। ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১-এ আমি ছিলাম গ্রামে। ঢাকায় আসি ১৮ ডিসেম্বর। ছোট ভাই শিল্পী আনিসের বাসা ছিল দিলু রোডে। তার সেই ছোট দুই কামরার বাড়িতেই শুরু হয় স্বাধীন দেশের রাজধানী ঢাকা শহরে জীবনযাত্রা। সেখান থেকে আমার অফিস ছিল কাছেই বেলি রোডে ‘গাইড হাউজ’। বদরুন আপার বাসা ছিল মগবাজার। সেটাও ছিল কাছেই। এখনো চোখের সামনে ছবির মতো সব কিছু ভাসছে। আমাদের নিজস্ব বাসস্থান ছেড়ে দিয়ে জিনিসপত্র গাইড হাউজের নির্মাণাধীন ভবনের এক জায়গায় অতি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখা হয়েছিল। অফিসে বদরুন আপা সংবাদ দিয়ে রেখেছেন আমি ঢাকায় এলেই যেন তার সঙ্গে দেখা করি। দেখা করতে গেলাম বদরুন আপার বাসায়। সেখানে শোবার ঘরের বিছানায় বসেছিলেন কবি সুফিয়া কামাল। অবাক আর বিস্মিত আমি। তাকে সালাম করতেই জড়িয়ে ধরলেন। আমার জমাট কান্না আর থামে না। জানতে চাইলেন ছোট ভাই লে. আতিকের কোনো খবর পেয়েছি কি না। মাথা নেড়ে জবাব দিলাম, খবর জানি না। বদরুন আপা ঘরে এসে বলেন, ‘এখন কাজের কথা শোন’। কান্নাকাটি সারাজীবন করা যাবে। খালাম্মা বললেন, মা-রে এখন আমাদের দরকার বিশ্বস্ত কর্মী। চুপচাপ কাজ করার মানুষ দরকার। জানতে চাইলাম খালাম্মার পরিবারের কথা, বঙ্গবন্ধুর পরিবারের কথা। খালাম্মা শান্ত কণ্ঠে বলেছেন, ভালো আছে। বেঁচে আছে সবাই। বদরুন আপার সঙ্গে দেখা করে, পাশেই দিলু রোড, আমাদের নতুন আশ্রয়ের জায়গায় চলে এলাম। পরদিন অফিসে গেলাম। সহকর্মী যারা ঢাকায় ছিলেন তারা আসতে শুরু করেছেন। রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রামে যারা ছিলেন তাদের খোঁজখবর নিতে শুরু করলাম। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হলো—খবরাখবর পেতে শুরু করলাম। আমার কমিশনার তাহেরা আপা, আফিফা আপার খোঁজ পেলাম। দেখা করলাম। গার্ল গাইডের কাজ নতুন করে গোছাতে শুরু করলাম। এরই মধ্যে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে বিভিন্ন জায়গা থেকে পাকবাহিনীর হাতে নির্যাতিত মা-বোনদের উদ্ধার করার কাজও শুরু করতে হয়েছে কবি সুফিয়া কামালের ডাকে। ভয়ংকর ও বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা। আজকের জাহাঙ্গীর গেট যেখানে সেখান থেকে একটু সামনে বাম দিকে অনেক বাংকার ছিল। সেখান থেকে চার নারীকে প্রথম উদ্ধার করতে যাই। বদরুন আপা সব ব্যবস্থা করে খবর দিয়েছেন। তার বাড়ির সামনে দুটো জিপ দাঁড়িয়ে আছে। একটাতে আমি উঠলাম। সঙ্গে কিছু কাপড়। আর যারা খবর নিয়ে এসেছে তারা। জিপ চালাচ্ছিলেন এক ভারতীয় সেনা। সেই বাংকার থেকে উদ্ধার করা চার নারীর সে কী বীভত্স অবস্থা। চুল ছোট করে কাটা, কোমরে একটা ন্যাকড়া জড়ানো, শরীরে কাপড় নেই। ধুলায় গড়াগড়ি করা শরীর। দাঁত দিয়ে একটা শাড়ি দুই টুকরা করে এক টুকরা মেয়েদের কোমরে প্যাঁচালাম, আরেক টুকরা ওপরে জড়িয়ে দিয়ে তুলে আনলাম। জিপে উঠিয়ে নিয়ে ইস্পাহানি কলোনির উলটোদিকে কয়েকটা পরিত্যক্ত বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন বদরুন আপা। তার হাতে মেয়েদের পৌঁছে দিলাম। তার কাছে শুনলাম কবি সুফিয়া কামাল ভেতরে অপেক্ষা করছেন। তিনি মেয়েদের ভেতরে নিয়ে গেলেন। আর আমাকে বাড়ি চলে যেতে আদেশ দিলেন। দিলু রোডের মাথায় একটা জিপ আমাকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল।

একদিকে গার্ল গাইড অ্যাসোসিয়েশন গোছাচ্ছি। অন্যদিকে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কবি সুফিয়া কামালের সঙ্গে কাজ করছি। তার ওপর নিজের সংসার, আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর নেওয়া। নিঃশব্দে কাজ করার সময় ছিল তখন। কথা শুনতে ভালো লাগত না। আর কথা বলার প্রশ্ন ওঠে না। অতি প্রয়োজনীয় কথা ব্যতীত অন্য কথা নয়।

কবি সুফিয়া কামালের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গেলে তার নেতৃত্বে নানা ধরনের কাজ হয়েছে সেসব কথা এসে যাবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন তিনি। অধিকার আদায়ের জন্য নেতৃত্ব দিয়েছেন। নারীদের সাহস জুগিয়েছেন। আর অত্যন্ত নীরবে একাত্তুরের মুক্তিযুদ্ধে পাকবর্বর সেনাদের হাতে নির্যাতিত নারীদের উদ্ধার-আশ্রয় ও পুনর্বাসনে আমাদের সাহস জুগিয়েছেন। বিশ্বস্তভাবে কাজ করার অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। এসব কথা জানিয়ে কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধাঞ্জলি তাকে না জানালেই নয়।

n লেখক :সমাজকর্মী