টুস টুস টুস! পুষি বিড়ালের মতো পা ফেলে রান্নাঘরের দিকে যায় পিয়াস। তিয়াসাকে নিয়ে মা শুয়ে আছেন ঘরে। বাবার অফিস থেকে ফিরতে আরো কিছুটা দেরি আছে। এটাই সুযোগ।
সাবধানে পা ফেলে পিয়াস। প্রথমে পায়ের গোড়ালি, তারপর আস্তে করে সামনের অংশ। মা টের পেলেই বিপদ। ধীরে ধীরে রান্নাঘরে ঢুকে ওপরে তাকের দিকে তাকায়, আনন্দে চোখ বড়ো হয়ে যায়। কৌটাটা আগের জায়গাতেই আছে। গুঁড়া দুধ—ডানোর কৌটা।
মেঝেতে একটা পিঁড়ি রেখে তার ওপর দাঁড়ায়। হাত বাড়িয়ে কৌটাটা নামিয়ে আনে। টেবিলের ওপর রেখে প্লাস্টিকের ঢাকনা খুলে ফেলে, ওয়াও! কী চমত্কার গন্ধ! চোখ বন্ধ করে বড়ো নিঃশ্বাস টেনে গন্ধ নেয়। তারপর চোখ খুলে ভেতরে তাকাতেই চোখ ছানাবড়া। গতকাল যখন এভাবে গুঁড়া দুধ খেয়ে রেখে দিয়েছিল তখন কৌটার অর্ধেক ছিল। আজ হঠাত্ ভরে গিয়েছে। কৌটা তো আগেরটাই, তাহলে ভরে গেল কীভাবে? অবাক করা ঘটনা। ভাবতে ভাবতেই ভেতরে থাকা প্লাস্টিকের চামচভর্তি দুধ নিয়ে ডান হাতের তালুতে রাখে। এরপর জিহ্বা দিয়ে চাটতে শুরু করে। উফ্ কী মজা!
এমন সময় সদর দরজায় খুট করে শব্দ হয়। চমকে ওঠে পিয়াস, এই রে, বাবা বুঝি এল! এখনই ধরা পড়ে যাবে। দ্রুত বাম হাতে কৌটাটা আগের জায়গায় রেখে দেয়। এরপর ডান হাতের তালুতে থাকা দুধ মুখের মধ্যে চালিয়ে দেয়। হাত দুটো পেছনে রেখে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে সে। এরমধ্যে বাবাও ঢুকে পড়েছে বাসার মধ্যে। পিয়াসকে দেখেই একটা মুচকি হাসি দিয়ে বললেন—কী খবর পিয়াস, স্কুলে গিয়েছিলে?
পিয়াস কিছু বলতে পারে না, গুঁড়া দুধ মুখের রসে ভিজে আঠালো হয়ে দুই চোয়াল আটকে ধরেছে। কী মুশকিল! দুই ঠোঁট প্রসারিত করে হাসার চেষ্টা করে পিয়াস। বলে—উমমম
বাবাও জবাব দেয়—উমম
—উমমম
—উমমমম
এভাবে ইশারায় কিছু কথা বলার পর বাবা একটা হাসি দিয়ে ঘরে ঢুকে যায়। পিয়াস এক গ্লাস পানি মুখে দিয়ে যেন মুক্তি পায়। এরপর বেসিনে যায় হাত ধুতে। সামনের আয়নায় তাকিয়ে চোখ বড়ো হয়ে যায়। হায় হায় একি! নাকে, ঠোঁটে, গালে লেগে আছে গুঁড়া দুধ। তার মানে বাবা সব জেনে গেছে। ছিঃ ছিঃ ছিঃ! এ বেলায় আর বাবার সামনে যাওয়া যাবে না। হাত-মুখ ধুয়ে নিজের পড়ার ঘরে এসে চুপচাপ শুয়ে থাকে পিয়াস।
পরদিন আবারও ভয়-লজ্জা ভুলে রান্নাঘরে যায় পিয়াস। গুঁড়া দুধের লোভ সামলানো বড়ো কঠিন। তিয়াসাকে প্রতিদিন গরম দুধ গ্লাসে করে খাওয়ায় মা। পিয়াসের সেটা একদম ভালো লাগে না। তার এভাবেই ভালো লাগে। হাতের তালুতে করে চেটে চেটে খাওয়া।
এভাবে খেতে খেতে একদিন কৌটার অর্ধেক হয়ে যায় দুধ। আবারও চিন্তায় পড়ে যায় সে। এবার মা ঠিক ধরে ফেলবে। কিন্তু না, পরদিন আবারও কৌটা ভরে যায়।
কেমন একটা রহস্যের গন্ধ খুঁজে পায় পিয়াস। তিয়াসাকে মা অন্য একটা কৌটা থেকে দুধ খাওয়ায়। তাহলে এই কৌটায় দুধ রাখা হয় কেন? কীভাবে তা কমে গেলে আবার পূরণ হয়ে যায়?
পিয়াস ইদানীং রহস্য-গোয়েন্দা গল্প পড়া শুরু করেছে। সে ভাবতে থাকে, এই কৌটায় কী রহস্য থাকতে পারে? বাবা-মাকে বললে হয়তো জানা যাবে, কিন্তু তা তো বলা সম্ভব নয়। কারণ সে যে চুপে চুপে দুধ খায়—এটা তো তারা জেনে যাবে।
অবশেষে রান্নাঘর পাহারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল পিয়াস। পড়ার ঘরের দরজা একটু ফাঁক করে রেখে রান্নাঘরের দিকে খেয়াল রাখছে সে। আবার কখনো ডাইনিং টেবিলের নিচে গিয়ে বসে থাকে পিয়াস। এভাবে তিন দিন চোখে চোখে রাখার পর আসল ঘটনা জানতে পারে সে।
ডাইনিং টেবিলের নিচে সেদিন সন্ধ্যায় চুপচাপ বসে ছিল পিয়াস। ওদিকে পড়ার ঘরে নিজের ভয়েস রেকর্ড করে মোবাইলে বাজিয়ে রেখেছে। সবাই ভাবছে পিয়াস জোরে জোরে পড়ছে। কিন্তু পিয়াস এখন টেবিলের নিচে। তার চোখ আটকে আছে রান্নাঘরের দিকে। বাবা চুপিচুপি রান্নাঘরে ঢুকলেন। একটা পলিথিনের মোড়ক কাঁচি দিয়ে কাটলেন, তারপর গুঁড়া দুধের কৌটা খুলে তার মধ্যে ঢেলে দিলেন। কৌটা আগের জায়গায় রেখে পা টিপে টিপে বের হয়ে গেলেন বাবা।
পিয়াসের কাছে সব পরিষ্কার হয়ে গেল। বাবাই তার জন্য এভাবে দুধ রেখে দেন। কারণ পিয়াস এভাবেই খেতে পছন্দ করে। পিয়াস ভাবতে থাকে, সব বাবাই কি এরকম, নিজেকে আড়ালে রেখে সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে থাকেন?
অলংকরণ :সোহেল আশরাফ