একটি বছর পার হয়ে নবনীতা দেব সেন-এর প্রয়াণদিবসটি ঘুরে এল। এই দিনে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানোর উদ্দেশ্যে এই লেখা। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখাতে তাঁর যে বিশাল অবদান, সেগুলোর আলোচনা বা মূল্যায়ন করার পরিসর এখানে নেই, সেই যোগ্যতাও এই লেখকের নেই। এই লেখাতে সেই বিশাল অবদান সম্পর্কে কিছু আলোচনা করব, যাতে এখন যারা তরুণ সাহিত্যপ্রেমী, নবনীতার সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে তাদের যেন আগ্রহ বাড়ে। ব্যক্তিজীবনের ও সমাজ জীবনের উপলাকীর্ণ পথে সত্যসন্ধানে অনুপ্রেরণা পেতে তাঁর সাহিত্যকর্মে প্রবেশ করা প্রয়োজন অনুসন্ধানী মন নিয়ে।
নবনীতা দেব ১৯৩৮ সালে যখন কলকাতাতে জন্মগ্রহণ করেন, তখনো ভারত অবিভক্ত। তাঁর বাবা নরেন্দ্র দেব, মা রাধারাণী দেবী দুজনেই ছিলেন কবি-সাহিত্যিক। বাড়িতে ছিল সাহিত্যের পরিবেশ, বহু সাহিত্যিকের যাওয়া-আসা। ছোটবেলায় ছিল মায়ের মুখে রবীন্দ্রনাথের ছড়া শোনার আনন্দ। তবে শিশু বয়স থেকেই কঠিন অভিজ্ঞতা ও দুঃখের সাথেও হয়েছে পরিচয়—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বোমার আতঙ্ক, বাঙ্কারে আশ্রয় নেওয়া। তারপর মন্বন্তর—ভিখিরির দল খুদ-ফ্যানের জন্য দ্বারে আসছে। তারপর স্বাধীনতা—কিন্তু তার সাথে দাঙ্গা, শরণার্থীদের প্রবেশ।
শিক্ষাজীবনে সব সময়ই ছিলেন সফল—স্বদেশে উচ্চশিক্ষার্জন করেছেন প্রেসিডেন্সি কলেজ ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বিদেশে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ এবং ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি লাভ করেন।
পড়াশোনার সাথে সাহিত্যকর্ম চলে। প্রথমে কবিতা দিয়ে শুরু। ১৯৫৯ সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়, ‘প্রথম প্রত্যয়’। তাঁর পরবর্তী জীবন-সাহিত্য-কর্ম, সব এই প্রত্যয়ের প্রতিফলন। এতদিন পরিচিত ছিলাম প্রথম প্রেম, প্রথম আলো ইত্যাদি শব্দগুচ্ছের সাথে। সেখানে ‘প্রথম প্রত্যয়’ কাব্যগ্রন্থ পরিচয় করিয়ে দিল এক প্রত্যয়ী কবির সাথে। এই প্রত্যয়, কর্মনিষ্ঠা, উত্তরণের প্রতিজ্ঞাই পরবর্তী জীবনের সফল শিক্ষক, সফল সুবক্তা, অনন্যসাধারণ প্রজ্ঞাময় সাহিত্যিককে এগিয়ে নিয়েছে। এনে দিয়েছে দেশে-বিদেশে বহু স্বীকৃতি। ১৯৯৯ সালে পেয়েছেন সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার এবং তার পরের বছর স্বীকৃতি হিসেবে লাভ করেছেন ‘পদ্মশ্রী’। কৌতূহলী পাঠকের জন্য এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে তিনি প্রায় একশত গ্রন্থের রচয়িতা। খ্যাতনামা অনেক প্রতিষ্ঠানে সাময়িকভাবে গবেষক হিসেবে আরও অনেক গবেষণা-প্রবন্ধের স্রষ্টা।
শিশু-কিশোরদের জন্য আকর্ষণীয় গল্প-রূপকথা লেখা কিন্তু বড়োদের জন্য ছোটগল্প-উপন্যাস রচনার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত; এখনকার কালে। নবনীতা দেব সেন তাঁর অন্যান্য সাহিত্যকর্মে আরো সময় দিলে তাঁর নিজের সুনাম হয়তো বাড়ত, কিন্তু ছোটরা বঞ্চিত হতো তাঁর ঝলমলে গল্পের ঝুলি থেকে।
তাঁর সাহিত্যের মানবিক দিকটি তাঁর অন্য সব সাহিত্যকর্মেও প্রতিফলিত—কিন্তু ছোটদের গল্পগুলোতে তা আরো দীপ্তিময়। এগুলো পড়লে মনে হয় মমতার একটি স্নিগ্ধ হিল্লোল বয়ে গেল।
সামাজিক গল্পগুলোতে সমসাময়িক ঘটনা, স্কুলে যাওয়া নিয়ে সমস্যা, কিশোরী পাচার ও উদ্ধারের কাহিনি এসব কিছুই আছে—কিন্তু সেখানে ঘটনার ঘনঘটার চেয়ে ভাবনার বিষয় বেশি। সত্যি ঘটনা সংবাদপত্রের রিপোর্টে পরিণত না হয়ে কীভাবে সরস গল্প হতে পারে সেটা নবনীতার নিপুণ বিন্যাসে ধরা পড়েছে।
রূপকথাতে চিরকাল শুনেছি রাজপুত্র ঘুমন্ত রাজকন্যাকে সোনার কাঠি ছুঁইয়ে জাগিয়ে তুলেছে, দৈত্যপুরী থেকে উদ্ধার করেছে; রাজা, মন্ত্রীরা দীন-দুঃখীর দুর্দশা দূর করেছে। বাবা-মা, তা সে সাধারণ মানুষ হোক, রাজাধিরাজ হোক, মেয়ের বিয়ের জন্য হন্যে হচ্ছে। এমনকি ছোট ছেলেটিও বোনকে আগলে রাখছে। আর নবনীতা তাঁর সোনার কাঠির ছোঁয়ায় রূপকথাকে নতুন প্রাণে জাগিয়ে তুলেছেন। এখানে কিশোরী মেয়েটি জাদু করে রাখা পরি-রূপকুমারকে ইঁদারা থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে গামছা পরিয়ে। পদ্মমুখী নামের ছোট্ট মেয়েটি কাঠবেড়ালি বন্ধুর সাথে বেরিয়ে গিয়ে ডাকাতের কারসাজিতে বন্দি হওয়া বাবাকে উদ্ধার করে। তবে সে এতই ভালো মেয়ে যে ঘরে বসে নামতা শেখে, অঙ্ক কষে। অর্থাত্ বুঝিয়ে দেওয়া হলো যে সে এই চেনা জগতেরই একজন। এগুলো ছোটদের-বড়োদের সবারই চিন্তার জগেক নাড়িয়ে দেবে। তবে দুশ্চিন্তার কিছু নেই—এগুলোকে কখনোই নারীবাদের স্লোগান মনে হবে না। গল্পে সবই এত সহজ-স্বাভাবিক ঘটনাপ্রবাহে এসেছে যে, অন্যরকম কিছু হতে পারত, সেটা মনেই হবে না। মনে হবে, অন্যরা কেন এভাবে দেখে না, কেন এমন গল্প খুঁজে পায় না।
কবিতার আলোচনাতে আঙ্গিক, অলংকার ইত্যাদিতে না গিয়ে অল্প কিছু উদ্ধৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখব। প্রথমে বলতে হয় ভালোবাসার কথা—কবিতাতে তো সেটা থাকবেই। ভালোবাসা খুঁজতে, কাকে বলে ভালোবাসা সেটা বুঝতে কত হন্যে হওয়া—কেউ খুঁজে পায়, প্রাত্যহিকতার মধ্যে :
ভালবাসা ৪
‘ভালবাসা তুমি কবিদের কথা শুনো না
এসো ভালবাসা, পা ধুয়ে বোসো এ পিঁড়িতে
এখানে তোমার চেনাভিটে সাতপুরুষের।’
ভালোবাসা ৫
‘এসো ভালবাসা বোসো এইখানে সোফাতে—
চা খাবে? পাখাটা বন্ধ করে দি? জানালা?
... ... ...
তারপর? বড়ো শীত পড়ে গেল অকালে।’
ভালোবাসার হাত ধরেই আসে অভিমান। তাই তো বললেন, দ্বীপান্তরে চলে যাব। ‘দ্বীপান্তরী’ কবিতার একটি লাইন—
‘সেই দ্বীপে কোনোদিন তোমাদের জাহাজ যাবে না।’
ডাকঘরের অমল রাজার চিঠির প্রতীক্ষায় দিন কাটাত। কারো ডাক শোনার জন্য আকুলতা আজও—তাই ‘টেলিফোন’ কবিতাতে—
‘... অনেক দূরে টেলিফোন বাজতে থাকে।
আমি অস্থির হয়ে শুনতে পাই, কেউ
সাড়া দিচ্ছে না, ফোনটা বেজেই চলেছে
একটানা। যদিও জানি তা এ বাড়ীতে নয়,
ও বাড়ীতে নয়, কোনো বাড়ীতেই নয়।’
তারপর আসে ভালোবাসা-অভিমান ছাড়িয়ে দৃপ্ত ‘উচ্চারণ’, ‘উল্টা-সোজা’ ধরনের কবিতা, ব্যাপকতর বৈশ্বিক প্রসঙ্গ।
বহু কবি-সাহিত্যিক যখন নবনীতা সম্পর্কে কিছু লিখেছেন—একটি প্রসঙ্গ সবাই উল্লেখ করেছেন। তা হচ্ছে হাস্যরসের দীপ্তি—সেটা কখনো ম্লান হাসি, কখনো মৃদু, কখনো হুল্লোড়ে, দু-এক ক্ষেত্রে অট্টহাসি। তার গাঁথুনি রয়েছে শব্দচয়নে, বর্ণনাতে, ঘটনা বিন্যাসে। তাঁর সব গদ্য সাহিত্য এই গুণে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে—সেটা ছোটগল্প, উপন্যাস বা ভ্রমণকাহিনি—যা-ই হোক না কেন। স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠ গল্পের সংকলনটিতে সব গল্প হয়তো ছোটগল্পের সংজ্ঞাতে পড়বে না—কিন্তু না থেমে পড়ার মতো ও আনন্দঘন। ‘আবার এসেছে আষাঢ়’—না, এটা প্রেমের গল্প নয়—ভারী বর্ষণে ঘরের ভিতরে জল জমে যাওয়ার সরস গল্প।
এদিকটি তো সহজে চোখে পড়ে, সবাই বলেছে। গদ্য সাহিত্যে অন্য যেটা আকর্ষণীয় তা হচ্ছে গভীর এক মানবিকতার বোধ। যখন যাকে নিয়েই নবনীতা লিখেছেন, পড়ে মনে হবে, তাকে তিনি গভীরভাবে ভালোবাসেন, তা সে মেজকাকীমাই হোক, আর ভুল-নম্বরে ফোন করা দোকানদারই হোক।
ভ্রমণকাহিণির একটিই উল্লেখ করব—যদিও গিয়েছেন বহু দেশে, বিচিত্র কারণে। সেটি হচ্ছে হিমালয়ের পাদদেশে তীর্থস্থানে ভ্রমণের বিষয় ‘হে পূর্ণ তব চরণের কাছে’ এই শিরোনামে। সেকালে এই ভ্রমণ কঠিন ছিল। সেই পটভূমিতে নানান বাহনে, হরেক রকম সঙ্গী-সাথীর সাথে অনুজ এবং তরুণী কন্যাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে পথ চলা। সেই বিবরণে প্রকৃতির অকৃপণ সৌন্দর্যের বর্ণনার সাথে সহযাত্রী ও যাত্রাপথের সামাজিক প্রসঙ্গ মিলেমিশে গিয়েছে। তাঁর ইচ্ছে ব্যক্ত করেছেন—পরের বারে একা যাবেন, ওখানে দর্শন পাওয়া কিছু সন্ন্যাসীদের মতো। আমি বলব, সেই ভ্রমণকাহিনি আকর্ষণীয় হবে না—চারপাশে বিচিত্র মানুষ ছাড়া সৌন্দর্য পুরো হয় না। হিমালয়ের বরফের পটভূমিতে চাঁদ উঠেছিল—সেই বর্ণনার অধ্যায়টির শিরোনাম ‘ও চাঁদ’। পূর্ণচন্দ্রের সৌন্দর্য বর্ণনায় এই শিরোনামটি মনে করিয়ে দেয় রবীন্দ্রনাথের সেই গান—তাতে অন্য কিছু না বলেও যোগ হলো একটি নতুন মাত্রা। ‘চোখের জলের লাগলো জোয়ার’ যখন, তখনই নবনীতা ‘ও চাঁদ’ খুঁজে পেয়েছেন সারাজীবন।
নবনীতা দেব সেন নিজেকে নারীবাদী হিসেবে ঘোষণা করনেনি—তাঁর সাহিত্যকর্ম এই পরিচয়টি বলে দেয়। তিনি উল্লেখ করেছেন তিনি বক্তৃতা-স্লোগান দিয়ে বলেন না। তাঁর লেখা বেশ কিছু কবিতাতে এসেছে সমাজে নারীর কাছে অহেতুক এবং অন্যায় প্রত্যাশার বিষয়ে তির্যক পঙিক্ত। ছোটদের গল্পে এসেছে কিশোরী মেয়েটিকে নতুন নতুন সাহসী ভূমিকাতে প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে সাধারণ মেয়েকে জয়ী করে দেবার কথা। এসেছিল রবীন্দ্রনাথে। সাহিত্যিকরা, অধিকাংশ, সেই জিতিয়ে দেওয়ার সাহস করেন না। নবনীতা করেছেন। নারীবাদের স্বপক্ষে প্রত্যক্ষ বক্তব্য এসেছে সীতার কাহিনির পুনর্বয়ানে এবং এই সংক্রান্ত গবেষণাতে লিখেছেন ‘Lady sings the Blues : When Women retell the Ramayana’—যেটি লেখা হয়েছিল কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘The Sita Symposium’-এর জন্য।
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সেই এলাকার নিজস্ব ভাষাতে গ্রামীণ নারীরা সীতার দুঃখ-বঞ্চনা নিয়ে যেসব গান করেন, সেগুলো নিয়ে আলোচনা (সেই সাথে অবশ্যই তার ইংরেজি অনুবাদ)। এই একই বিষয়ে, রামায়ণে নারীর অবস্থান নিয়ে আরো অনেক গবেষণা করেছেন। কী কঠিন পরিশ্রম, দক্ষতা ও অধ্যবসায়ের প্রয়োজন এসবের গভীরতাতে পৌঁছাতে। তাঁর বিশাল ব্যাপক সাহিত্যকর্মের অল্প কিছু অংশতে দৃষ্টিপাত করলেও তাই, ‘বড়ো বিস্ময় লাগে’।
নবনীতা দেব সেন [১৩ জানুয়ারি ১৯৩৮—৭ নভেম্বর ২০১৯]