রাজধানীর কুর্মিটোলায় বহুল আলোচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) এক ছাত্রীকে ধর্ষণ মামলার একমাত্র আসামি মজনুর যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরো ছয় মাসের কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭-এর বিচারক বেগম মোসাম্মত্ কামরুন্নাহার এ রায় ঘোষণা করেন। এর আগে বেলা আড়াইটার দিকে মজনুকে আদালতে হাজির করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, এ সময় আদালত চত্বরে মজনু অস্বাভাবিক আচরণ করেন এবং কাঠগড়ায় পুলিশকে মারধর করেন। এদিকে মজনুর যাবজ্জীবন সাজার রায়ে সন্তুোষ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি আফরোজা ফারহানা আহম্মেদ অরেঞ্জ। তিনি বলেন, ‘আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি।’ তবে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে মজনুর আইনজীবী (সরকার থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত) রবিউল ইসলাম বলেন, ‘রায়ের বিরুদ্ধে আমরা উচ্চ আদালতে যাব।’
জানা গেছে, মাত্র ১৩ কার্যদিবসে মামলাটির বিচার কার্যক্রম শেষ হয়েছে। গত ১২ নভেম্বর ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭-এর বিচারক উভয় পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে রায় ঘোষণার জন্য ১৯ নভেম্বর দিন ধার্য করেন। মামলার ২৪ সাক্ষীর মধ্যে ২০ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন।
কাঠগড়ায় মজনুর হামলা :প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, আদালতের কাঠগড়ায় তোলার পরপরই মজনু সেখানে দায়িত্বরত উপপরিদর্শক (এসআই) নৃপেনের ওপর হামলা চালান। মজনু এসআইয়ের গলা চেপে ধরে কিল-ঘুষি মারেন। তখন অন্য পুলিশ সদস্যরা এসে এসআই নৃপেনকে সরিয়ে নেন। এছাড়া মজনু সেখানে দায়িত্বরত অন্য পুলিশ সদস্যদের গালাগালি করেন। তখন আদালতকক্ষে বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হয়।
এ সময় মজনু পুলিশ, আইনজীবী ও সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলতে থাকেন, ‘আমি এতিম, অসহায়। আমার পক্ষে কেউ নাই। আমারে ছাইড়া দেন, আমি বাড়ি চলে যাব। আমি জখম করিনি। আমি ধর্ষণ করিনি, ধর্ষণ করেছে চার জন লোক। আমি তাদের চিনি। আমাকে পিটাইয়া হাতের আঙুল ভেঙে ফেলছে। পুলিশ আমাকে মাইরা টিপসই নিয়ে গেছে। আমারে এক বছর আটকাই রাখছে। জেলে মশার কামড় খাইয়া থাকতে পারছি না। আমারে শুধু কচুর ডাল খাওয়ায়। আমারে ছাইড়া দেন।’
পেছনের কথা :অভিযোগপত্রে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, গত ৪ জানুয়ারি ঐ ছাত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষণিকা বাসে করে তার বান্ধবীর বাসা শেওড়ার উদ্দেশে রওনা হন। সন্ধ্যা ৭টায় ছাত্রী শেওড়া বাসস্ট্যান্ডে না নেমে কুর্মিটোলা বাসস্ট্যান্ডে নেমে যান। ভুল বুঝতে পেরে তিনি ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে থাকেন। তখন ভবঘুরে প্রকৃতির লোক মজনু ফুটপাতের পাশে ইটের তৈরি বেঞ্চে বসে ছিলেন। ছাত্রীটি কাছাকাছি আসতেই মজনু পেছন দিক থেকে হঠাত্ ধাক্কা দিয়ে তাকে পাশের কাঁটা ঝোপের ভেতরে ফেলে দেন। তখন ছাত্রী চিত্কার করতে থাকলে মজনু গলা চেপে ধরে তার মুখে, বুকে ও পেটে কিল-ঘুষি মারেন।
অভিযোগপত্রে আরো বলা হয়েছে, আসামি মজনু ছাত্রীর গলা চেপে ধরায় তিনি নিস্তেজ হয়ে যান। একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তখন মজনু তাকে ধর্ষণ করেন। ধর্ষণের পরে মজনু ছাত্রীর ব্যাগ থেকে একটি প্যান্ট বের করে তাকে পরিয়ে দেন। ছাত্রী জ্ঞান ফেরার পর চলে যাওয়ার চেষ্টা করলে মজনু টাকা, মোবাইল ফোন ও ব্যাগ ছিনতাইয়ের জন্য তার গলা চেপে ধরে কিল-ঘুষি মারেন। একপর্যায়ে মজনু ছাত্রীর কাছ থেকে ২ হাজার টাকা, মোবাইল ফোন ও ব্যাগ ছিনিয়ে নেন। এরপর ছাত্রী দৌড়ে রাস্তা পার হয়ে একটি রিকশায় উঠে তার বান্ধবীর বাসায় যান। বান্ধবীকে বিষয়টি জানালে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি করা হয়।
মামলা দায়ের :ঘটনার পরদিন গত ৫ জানুয়ারি সকালে অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করে ঐ ছাত্রীর বাবা ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি উত্তর)। ৮ জানুয়ারি মজনুকে গ্রেফতার করে র্যাব। ৯ জানুয়ারি সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে মজনুকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। ১৬ জানুয়ারি ধর্ষণের দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন অভিযুক্ত। পরে তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে পুলিশ। গত ২৬ আগস্ট ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭-এ মজনুর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।