করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এবং টিকার রাজনীতি

প্রতি ১৭ সেকেন্ডে একজন করিয়া মানুষ মারা যাইতেছে করোনায় আক্রান্ত হইয়া। এই চিত্রটি কেবল ইউরোপের। শীতকাল শুরু হইতেই শীতপ্রধান ইউরোপে এখন করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ভয়াবহ আকার ধারণ করিতেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে ইউরোপে মাত্র এক সপ্তাহেই করোনায় মৃত্যুবরণ করিয়াছে ২৯ হাজার মানুষ! এই দিকে, আমেরিকাতেও গত চার সপ্তাহে করোনায় মৃত্যুহার ৪২ শতাংশ বৃদ্ধি পাইয়াছে। বিশ্বের প্রথম দেশ হিসাবে আমেরিকাতে করোনায় মৃত্যু ছাড়াইয়া গিয়াছে আড়াই লক্ষ! অনেক বিশ্লেষকের মতে, সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভরাডুবির নেপথ্যেও রহিয়াছে করোনা ভাইরাস। কোভিড পরিস্থিতি মোকাবিলায় ট্রাম্পের চোখে পড়ার মতো ব্যর্থতা তাহাকে ক্ষমতা হইতে ছিটকাইয়া ফেলিয়াছে। এই দিকে একটি জাতীয় দৈনিকের শীর্ষ প্রতিবেদন হইতে জানা গিয়াছে, শীত মৌসুম শুরু হইতেই দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে করোনা সংক্রমণ পুনরায় ঊর্ধ্বমুখী হইতেছে। বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করিতেছেন, এই দেশে করোনার প্রথম ঢেউ এখনো শেষ হয় নাই। কিন্তু দ্বিতীয় ঢেউ যে আসিবে, তাহা ইউরোপ আমেরিকার করোনার দ্বিতীয় অভিঘাত বলিয়া দিতেছে। ইউরোপে শীত আমাদের তুলনায় অনেক পূর্বে শুরু হয়, তাই ঢেউটিও পূর্বে আসিয়াছে।

আট মাস পূর্বে বাংলাদেশে করোনা শনাক্তের পর বর্তমানে সাধারণ মানুষের ভিতরে একধরনের ঔদাসীন্য ভাব কাজ করিতেছে। ইউরোপের অনেক দেশই পুনরায় লকডাউনে যাইতে বাধ্য হইয়াছে। কিন্তু লকডাউনে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভয়াবহ ক্ষতি হয়। সুতরাং ইউরোপের মতো চাহিলেই আমাদের দেশে সহজে লকডাউন প্রয়োগ করা সম্ভব নহে। এই কারণে করোনার আসন্ন দ্বিতীয় ঢেউ সামলাইতে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মানিয়া চলিবার আহ্বান জানাইয়াছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। করোনার আসন্ন বিপদ যদি সাধারণ মানুষ বুঝিতে না পারেন, তবে তাহা অসংখ্য অকালমৃত্যুর কারণ হইয়া উঠিতে পারে। মনে রাখিতে হইবে, করোনা ভাইরাস মূলত ছড়ায় মুখ দিয়া। সুতরাং মাস্ক না পরিয়া হাঁচি-কাশি দিলে জীবাণুকণা অর্থাত্ ড্রপলেট অন্যদের মধ্যে ছড়াইয়া পড়িবে। এমনকি মাস্ক ছাড়া জোরে জোরে কথা বলিলেও মুখ হইতে অসংখ্য ড্রপলেপ তথা জীবাণু বাহির হয়। শীতে আর্দ্রতা কম থাকায় ড্রপলেট দ্রুত শুকাইয়া ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। এই কারণে শীতকালে বাতাসের মাধ্যমে করোনা জীবাণুর সংক্রমণ বাড়িবার আশঙ্কা করা হইতেছে। সম্প্রতি ব্রিটেন ও ইতালির একদল বিজ্ঞানীর গবেষণায় জানা গিয়াছে, করোনায় আক্রান্ত হইবার প্রথম সপ্তাহেই অসুস্থ করোনা রোগীর শরীর হইতে রোগটি সবচাইতে বেশি ছড়ায়। আরেকটি ভয়ংকর তথ্য দিয়াছেন এই গবেষকরা। তাহারা জানাইয়াছেন, সাধারণত ৯ দিন অবধি  করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শরীরে থাকে, কিন্তু সেই ভাইরাসের শেডিং তথা ছড়াইয়া পড়িবার ক্ষমতা থাকে প্রায় ৮৩ দিন অবধি। জীবন্ত ভাইরাস না থাকিলেও আরএনএ শেডিংয়ের ক্ষেত্রে ভাইরাস থাকিতে পারে এত দিন অবধি!

শেষ কথা হইল টিকা লইয়া। টিকার ব্যাপারে আমেরিকার ফাইজার, মডার্না, ব্রিটেনের অক্সফোর্ড, রাশিয়ার স্পুটনিক এখন অবধি আশার কথা শুনাইয়াছে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে অক্সফোর্ডের ৩ কোটি ডোজ টিকার বরাদ্দ দিয়া রাখিয়াছে। টিকাগুলি আসিবে ভারতের মাধ্যমে। আর ভারতের টিকা প্রস্তুতকারক সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার সিইও জানাইয়াছেন, আগামী বত্সর ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই স্বাস্থ্যকর্মী ও প্রবীণ নাগরিকরা অক্সফোর্ডের টিকা পাইবেন এবং এপ্রিল মাসের মধ্যে সাধারণ মানুষের জন্য মিলিবে করোনার টিকা। অনেকে আশঙ্কা করিতেছেন, বিশ্বব্যাপী টিকার রাজনীতি শুরু হইতে পারে। তবে ইহা স্পষ্ট যে, কোভিড এমন একটি রোগ, যাহার একজন বাহক থাকিলেও এই বিশ্ব ঝুঁকির মধ্যে থাকিবে। বিশ্বের পরাশক্তিরা নিশ্চয়ই তাহা জানেন।