নাজমুন্নাহার নিপা
বাতাসে মিশে থাকে বিভিন্ন ধরনের বস্তুকণা। এই বস্তুকণার (পার্টিকুলেট ম্যাটার বা পিএম) পরিমাপ করা হয় প্রতি ঘনমিটারে মাইক্রোগ্রাম (পিপিএম—পার্টস পার মিলিয়ন) এককে। এসব বস্তুকণাকে ১০ ও ২.৫ মাইক্রোমিটার ব্যাস শ্রেণিতে ভাগ করে তার পরিমাণের ভিত্তিতে ঝুঁকি নিরূপণ করেন গবেষকরা। তাঁরা বলেন, বাতাসে প্রতি ঘনমিটারে ২.৫ মাইক্রোমিটার ব্যাসের বস্তুকণার পরিমাণ (পিপিএম) যদি শূন্য থেকে ৫০-এর মধ্যে থাকে, তাহলে ঐ বাতাসকে বায়ু মানের সূচকে (একিউআই) ভালো বলা যায়। এই মাত্রা ৫১ থেকে ১০০ হলে বাতাসকে মধ্যম মানের এবং ১০১ থেকে ১৫০ হলে বিপত্সীমায় আছে বলে ধরে নেওয়া হয়। আর পিপিএম ১৫১ থেকে ২০০ হলে বাতাসকে অস্বাস্থ্যকর, ২০১ থেকে ৩০০ হলে খুব অস্বাস্থ্যকর এবং ৩০১ থেকে ৫০০ হলে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর বলা হয়।
সম্প্রতি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দেখেছেন, প্রতি ঘন মিটার বায়ুতে বিপজ্জনক ধুলা ও বস্তুকণা পিএম ২.৫ যদি মাত্র এক মাইক্রোগ্রাম বাড়ে, তাহলে সেটি কোভিড-১৯-এ মৃত্যুর হার ৮ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। সুতরাং করোনার সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। নেদারল্যান্ডসের আরেকটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, দূষণের সংস্পর্শে আসার মাত্রায় মৃত্যুর হার ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ায়। যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের এক গবেষণায়ও কোভিড-১৯ সংক্রমণের তীব্রতা এবং গাড়ির ধোঁয়া বা জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো থেকে আসা নাইট্রোজেন অক্সাইড ও স্থল-স্তরের ওজোনের মতো দূষিত বায়ুর সংস্পর্শে দীর্ঘ মেয়াদে আসার মাঝে পারস্পরিক সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
যেহেতু শীতল আবহাওয়ার সময় আর্দ্রতা প্রচণ্ড হ্রাস পায় এবং ধুলার দূষণ মারাত্মক মোড় নেয়, তাই এ সময় কিছু ভাইরাল ফ্লু-র উত্থান এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের সংক্রমণ বেড়ে যায়। শীতের সময় ক্রমবর্ধমান ধুলাদূষণের কারণে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে হাঁপানি, নিউমোনিয়া, ফুসফুসের ব্যাঘাত রোগ, ব্রঙ্কাইটিস, ফুসফুসের ক্যান্সার ও শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সাধারণত বাড়ে। উচ্চ স্তরের বায়ুদূষণের সংস্পর্শ মানুষের শ্বাসযন্ত্র ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়, ফলে জন্ম হয় ঠান্ডাজনিত নানা রোগের, যা তাদের কোভিড-১৯-এর জন্য আরো সংবেদনশীল করে তোলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সম্প্রতি সতর্ক করে দিয়েছে, যেসব শহরে বায়ুদূষণের মাত্রা বেশি—সেখানে করোনা মহামারির বিরুদ্ধে তত্পরতা জোরদার করতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের বাতাসের মান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্যে দেখা যায়, গত চার বছর ধারাবাহিকভাবে দূষণের সময় বা দিন বাড়ছে। সাধারণত নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত রাজধানীর বাতাসে দূষণের মাত্রা বেড়ে অস্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে। সবচেয়ে বেশি দূষণ থাকে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
বায়ুদূষণ থেকে রেহাই পেতে আমাদের পরিবেশবান্ধব ইটভাটা, যানবাহন ও শিল্পকারখানা গড়তে হবে। বাতাসে ক্ষতিকারক উপাদান ছড়াতে পারে এমন জ্বালানি ব্যবহার বন্ধ করার পাশাপাশি ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। সবার ভেতর পরিবেশবান্ধব মনোভাব তৈরি করতে হবে। বায়ুদূষণ প্রতিরোধে সরকার, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, অন্যান্য সংস্থা ও জনগণ সমন্বিত উদ্যোগ নিলে সুফল বয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়। জাতীয়ভাবে পরিবেশ রক্ষার জন্য আমাদের সবার এগিয়ে আসা উচিত, সচেতন হওয়া উচিত।
সর্বোপরি, আমরা যখন বাসা থেকে বের হব তখন সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হবে। কোভিড-১৯ এবং দূষণ থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মাস্ক পরা। বায়ুদূষণের ফলে যেন করোনার প্রকোপ আগের মতো না বাড়ে, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। মানুষের সচেতনতাই পারে করোনা ভাইরাস দূর করতে।
শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ