পণ্য নয় মানুষ ভাবুন

ইকবাল হাসান

প্রতি বছর শীতকালে কম্বল বিতরণের হিড়িক পড়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছেয়ে যায় শীতার্তদের সাহায্য করার মানবিক ছবিগুলোতে। একজনের শেয়ার করা ছবির জন্য হয়তো আরেকজনের সাহায্য করার মনোবৃত্তি তৈরি হয়। কিন্তু প্রতিবছর এনজিও কিংবা ব্যক্তি উদ্যোগে যে শত শত কম্বল দেওয়া হয়, সেগুলোর ঠিকানা কোথায়?

ত্রাণের মতো কম্বল বিতরণ সাময়িক উদ্যোগ। বন্যার সময় সাময়িক বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার জন্য বন্যাক্রান্ত দুস্থ, গরিব মানুষকে ত্রাণ দেওয়া হয়। এতে তারা বিপদের সময়ে কিছু খেয়ে বাঁচতে পারে।

বন্যা, খরা কিংবা জলোচ্ছ্বাস পরবর্তী সময় এ ধরনের উদ্যোগ দেখা গেলেও অসহায়, গরিব, দুস্থ মানুষ যারা রাস্তায় পড়ে থাকে—তাদের শীতের তীব্রতা থেকে রক্ষা করতে এরকম উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না। এক রকম লোকদেখানো প্রতিবছরই কিছু কম্বল বিতরণ করা হয়। এতে জনগণের উন্নয়নে বিরাট ফাঁকি থেকে যাচ্ছে!

এই গরিব, ভবঘুরে, বাউণ্ডুলে মানুষগুলোও এদেশের নাগরিক। তাদেরও অধিকার রয়েছে মৌলিক অধিকারগুলো ভোগ করার। বস্ত্র, বাসস্থান দিয়ে তাদের এই মৌলিক অধিকারের চাহিদা কিছুটা লাঘব করা যায়। মানুষ মোটামুটি দুই পরিস্থিতিতে চুরি করতে পারে। এক পেটে ক্ষুধা থাকলে অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে। রাস্তায় শীতে কাতরানো মানুষগুলো পেটের ক্ষুধা মেটাতেই বেশিরভাগ চুরি, ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটিয়ে থাকে। তাদের এই চুরি, ছিনতাই শুধু আইন দিয়ে থামানো যাবে না। একবার শাস্তি দিলে তারা জেল থেকে বের হয়ে আবার একই কাজে লেগে পড়বে। অথবা জেলকেই অর্থাত্ বন্দি জীবনকেই জীবন ধারণের পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করবে। মোতাহের হোসেন চৌধুরীর ভাষায়, রাস্তায় কাতরানো মানুষটি জীবসত্তার ঘরেই পড়ে থাকবে, দোতলার ঘর মানবসত্তা অর্থাত্ মনুষ্যত্বের ঘরে পৌঁছাতে পারবে না।

সমাজ থেকে অপরাধ দূর করতে হলে মানুষকে পণ্য ভাবা বন্ধ করতে হবে। হরেক রকম কোম্পানি এসে গরিবের গায়ে কম্বল চাপিয়ে দিয়ে একটা ছবি তুলে চলে যাবে। আর চিত্কার করে বলবে আমরা এত এত মানুষকে সাহায্য করেছি। অথচ খোঁজ নিয়ে দেখা গেলে দেখা যাবে সেই ব্যক্তি অথবা কোম্পানি হয়তো তার ট্যাক্সই ঠিকমতো দেয়নি। ফলে, প্রত্যেক নাগরিকই তার অধিকার থেকে কোনো না কোনো ভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। এই করোনার সময়েও এরকম ব্যক্তিগত কিংবা কোম্পানির ব্রান্ডিং করতে দেখা গিয়েছে গরিব, খেতে না-পাওয়া মানুষদের দিয়ে। অনেক স্থানীয় নেতা গরিবদের নিয়ে ফটোসেশন করে চাল দেয়নি। তাদের এরকম প্রচারণা দেখে অনেকাংশেই মনে হয়েছে মানুষ যেন পণ্য! নানা কোম্পানি নানা রকমের সিল লাগিয়ে নিজেদের প্রোডাক্ট বলে দাবি করছে মানুষকে!

এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে হলে ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে আগাতে হবে। সাময়িক উপকারের নামে ছলনা না করে স্থায়ী পুনর্বাসনের প্রতি জোর দেওয়া উচিত।

শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়