চলে আমার সাইকেল...

ইতালিয়ান মুভি ‘বাইসাইকেল থিফ’ যারা দেখেছেন তারা নিশ্চয়ই উপলব্ধি করতে পেরেছেন সাইকেল কতটা প্রয়োজনীয়। বাঙালিদের কাছেও সাইকেল খুব শখের জিনিস। কৈশোরের শুরুতে কিংবা যৌবনে বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেদের কাছে সাইকেল খুব শখের জিনিস। সাইকেল চেপেই যেন হাওয়ায় উড়বার অনুভূতি পায় সবাই। এ নিয়ে গানই রয়েছে : ‘চলে আমার সাইকেল হাওয়ার বেগে উইড়া উইড়া...।’ তবে করোনাকাল এসে সাইকেলের গুরুত্ব আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। লকডাউনে যখন সবকিছু বন্ধ, তখন যাতায়াতের ভরসাই হয়ে উঠেছিল সাইকেল। শুধু তো প্রয়োজন নয়, এখন করোনাকালে সুস্থ-সবল শরীরকেই যখন প্রধান রক্ষাকবচ ধরা হচ্ছে তখন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে সাইকেল চালানোরই পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিত্সকরা।

ইউরোপসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে চীনে সাইকেল খুব জনপ্রিয়। অফিস আদালতে কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ সাইকেল চালিয়ে অফিস যাতায়াত করেন—এ কথা সর্বজনবিদিত। বাংলাদেশেও সাইকেল চালানোকে জনপ্রিয় করার চেষ্টা চলছে। সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি সুপ্রিম কোর্টে সাইকেল স্ট্যান্ড উদ্বোধন করতে গিয়ে সাইকেল চালানোর গুরুত্বের কথা যেমন স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, তেমনি সাইকেল চালিয়ে অফিস করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন।

বাংলাদেশের গ্রামেগঞ্জে সাইকেলের কদর রয়েছে। ইদানীং শহরেও তরুণদের মধ্যে সাইকেলের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। অপরদিকে শহুরে জীবনে যখন মাঠে খেলাধুলার সুযোগ খুব একটা নেই, তখন শিশুদের হাতেও সাইকেল তুলে দিচ্ছেন মা-বাবারা। অন্তত বাড়ির সামনের রাস্তায় সাইকেল চালিয়েও তো শরীরকে কিছুটা চাঙ্গা রাখা যায়!  যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অত্যাধুনিক মডেলের সাইকেল পাওয়া যাচ্ছে দেশের বাজারে। আগে এসব সাইকেল চীন ও ভারত থেকে আমদানি করতে হতো। তবে গত দেড় দশকে সে চিত্র গেছে পালটে। এখন দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও বাংলাদেশের সাইকেল রপ্তানি হচ্ছে। ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের সাইকেলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। পরিবেশবান্ধব বলে ইউরোপসহ উন্নত বিশ্বে সাইকেল জনপ্রিয় হওয়ায় দুই চাকার এই বাহন আশা দেখাচ্ছে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের।

পুরান ঢাকার সাইকেল বাজার

পুরান ঢাকার বংশাল হচ্ছে সাইকেলের সবচেয়ে বড় মার্কেটপ্লেস। এখানে শত শত সাইকেলের দোকান রয়েছে। রয়েছে পাইকারি ও খুচরা সাইকেলের বাজার। এখানে বড়দের সাইকেল যেমন পাওয়া যায়, তেমনি শিশু-কিশোরদের উপযোগী সাইকেলও মেলে। বিশ্বের হাল আমলের সাইকেলসহ সব ধরনের সাইকলে পাওয়া যায় এখানে। এখন তরুণদের মধ্যে রেসিং সাইকেল খুব জনপ্রিয়। তবে আকর্ষণীয় ডিজাইনের নানা সাইকেল মিলবে এখানে।

দেশীয় সাইকেলের বিদেশযাত্রা

প্রায় ২৫ বছর আগে ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে তাইওয়ানের কোম্পানি আলিতা বাংলাদেশ লিমিটেড স্বল্প পরিসরে বাংলাদেশ থেকে বাইসাইকেল রপ্তানি শুরু করে। পরে যুক্ত হয় মেঘনা গ্রুপ। এই ধারায় আরো এগিয়ে আসে আরএফএল গ্রুপ, এইস বাইসাইকেল লিমিটেড, ট্রান্সওয়ার্ল্ড বাইসাইকেল কোম্পানি, সিরাজ বাইসাইকেল লিমিটেড, জার্মানি-বাংলাদেশ বাইসাইকেল, নর্থ বেঙ্গল সাইকেল ইন্ডাস্ট্রিজসহ অনেক প্রতিষ্ঠান।

ইউরোপের বাজার

ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৮ সালে ইউরোপের বাজারে বাইসাইকেল রপ্তানিতে বাংলাদেশ উঠে এসেছে তৃতীয় স্থানে। যেখানে ২০০৮ সালে অবস্থান ছিল নবম, ২০১০ সালে ছিল পঞ্চম। ইউরোপিয়ান কমিশনের তথ্যানুযায়ী, ইইউর বাইরের বিভিন্ন দেশ থেকে ২০১৮ সালে ১০৮ কোটি ইউরোর বাইসাইকেল কিনেছে ইইউভুক্ত ২৮ দেশ। তার মধ্যে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ৬ কোটি ৫৪ লাখ ইউরো বা ৬৪২ কোটি টাকার বাইসাইকেল।