গাইবান্ধা জেলার উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা সামাদ মিয়ার ১৪ মাস বয়সি শিশু অল্প জ্বর ও সর্দিতে আক্রান্ত হয়। সামান্য জ্বর ভেবে চিকিত্সকের পরামর্শ না নিয়ে ফার্মেসির পরামর্শে ওষুধ খাওয়ান। এতে শিশুটি আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন গাইবান্ধা শহরে একটি ক্লিনিকে নিলে তারা উন্নত চিকিত্সার জন্য তাকে রংপুর মেডিক্যালে নেওয়ার সুপারিশ করে। রাতেই শিশুটির শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। সকালে রংপুর হাসপাতালে নেওয়ার পথে শিশুটি মারা যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে যেসব শিশু নিউমোনিয়ায় মারা যায়, তার ৫২ শতাংশই মারা যাচ্ছে বাড়িতে। তারা কোনো ধরনের চিকিত্সাও পায় না। অপরদিকে তিন শতাংশ শিশু চিকিত্সা পেয়েও বাড়িতে মারা যাচ্ছে। আবার হাসপাতালে বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসার পরেও নিউমোনিয়ায় মারা যাচ্ছে ৪৫ শতাংশ শিশু। তাই নিউমোনিয়ার লক্ষণ চিহ্নিত শিশুদের বাড়িতে রাখা যাবে না। তারা বলেন, দেশে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রতি ঘণ্টায় তিন জন শিশু মারা যায়। দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু মৃত্যুর অন্যতম কারণ নিউমোনিয়া। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এই রোগ-প্রতিরোধের বিষয়টি যতটা গুরুত্ব পাওয়ার কথা, ততটা পাচ্ছে না। গত দুই দশকে শিশুমৃত্যু হার হ্রাসে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যখাতে অনেক উন্নতি হলেও, দেশে প্রতিবছর ২৪ হাজার ৩০০ জন শিশু নিউমোনিয়ায় মারা যায়।
বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে-২০১৭ অনুযায়ী, ফুসফুসে সংক্রমণ দেখা দেওয়া পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে মাত্র ৪২ শতাংশকে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বা হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং মাত্র ৩৪ শতাংশ এন্টিবায়োটিক ওষুধ গ্রহণ করে। বাংলাদেশ হেলথ ফ্যাসিলিটি সার্ভে ২০১৭ অনুযায়ী নিউমোনিয়াজনিত শিশুমৃত্যুর ৪৫ শতাংশ ঘটে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর চিকিত্সাজনিত অপ্রতুলতার চিত্রও স্পষ্ট। এছাড়া বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ৫০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে নিউমোনিয়ার কারণ জানা যায় না। রোগের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান, পুষ্টিহীনতা হ্রাস এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়াজনিত মৃত্যু হার হ্রাস করা সম্ভব।
ঢাকা শিশু হাসপাতালের অধ্যাপক ও শিশু নিউমোনিয়া বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রুহুল আমিন বলেন, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে মৃত্যু হারের ১৮ শতাংশ নিউমোনিয়াজনিত মৃত্যু। এই মৃত্যু হার হ্রাসে তিনি শিশুকে দুই বছর পর্যন্ত মায়ের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। ছয় মাস পর থেকে মায়ের দুধের পাশাপাশি ঘরে তৈরি পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো, পরিবেশ দূষণ হ্রাস করা এবং শ্বাসকষ্ট হলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার ওপর প্রচারণা চালাতে গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানান।
চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সমীর সাহা বলেন, নিউমোনিয়া কোন জীবাণুর কারণে হচ্ছে সেটির ৫০ শতাংশই এখনো অজানা। সেটি কি ভাইরাসের মাধ্যমে হচ্ছে, না কি ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে, তা জানা নেই। নিউমোনিয়া প্রতিরোধ করতে হলে এই কারণ জানার উদ্যোগ নিতে হবে।
আইসিডিডিআরবির মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী বিজ্ঞানী আহমেদ এহসানুর রহমান বলেন, নিউমোনিয়াতে শিশুরা হাইপোক্সেমিয়ায় (রক্তে অক্সিজেনের স্বল্পতা) বেশি মারা যায়। কোভিডের সময় এটা আরো বেশি ঘটছে। যেসব শিশুর অক্সিজেনের স্বল্পতা থাকে, তাদের নিউমোনিয়ায় মৃত্যুহার বেশি। তাই প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পালস অক্সিমিটার থাকা জরুরি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) নিউমোনিয়ায় শিশুমৃত্যু কমাতে হাসপাতালগুলোতে ১০টি বিষয় নিশ্চিত করার কথা বলেছে। কিন্তু ২০১৭ সালে দেখা গেছে, বাংলাদেশের জেলা হাসপাতালগুলোতে এই ১০টি বিষয়ের শতভাগের মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ রয়েছে। বাংলাদেশের মাত্র ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিউমোনিয়ার পূর্ণাঙ্গ চিকিত্সা সক্ষমতা আছে। সমীক্ষায় আরো দেখা যায়, ৫০ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অক্সিজেন কনসেনট্রেটর নেই। অভিভাবকদের মধ্যেও সন্তানকে চিকিত্সার জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আনার প্রবণতা দুর্বল।
আইসিডিডিআরবির নিউট্রিশন অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল সার্ভিসেসের সিনিয়র বিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ জোবায়ের চিশতী বলেন, হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেন স্বল্পতা দূর করা জরুরি। প্লাস্টিক বোতল দিয়ে তৈরি ‘বাবল সিপ্যাপ’ নিউমোনিয়াজনিত শিশুমৃত্যু হার ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনতে সক্ষম। তিনি আরো বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, অপুষ্টির শিকার শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া আক্রান্ত ও মৃত্যুর প্রবণতা ১৫ গুণ বেশি।