সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর পৌর এলাকার শেরখালীতে (উকিলপাড়া) ফজলুল হক মাস্টারের বাড়িতে র্যাবের ছয় ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস অভিযানে চার জঙ্গি আত্মসমর্পণ করেছেন। তারা হলেন জেএমবির পাবনা-সিরাজগঞ্জের আঞ্চলিক আমির কিরণ ওরফে হামিম ওরফে শামিম, আমিনুল ইসলাম শান্ত, আতিউর রহমান ওরফে কলম সৈনিক ও নাইমুল ইসলাম। গতকাল শুক্রবার ভোর ৫টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত র্যাব-১২-এর সদস্যরা এই অভিযান চালান। এ সময় ঐ বাড়ি থেকে পিস্তল, চাপাতি, গান পাউডার, বোমা তৈরির সরঞ্জাম ও জিহাদি বই উদ্ধার করা হয়।
অভিযান শেষে র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার সংবাদ সম্মেলনে জানান, গতকাল রাতে রাজশাহীর শাহ মখদুম থানায় অভিযান চালিয়ে জেএমবির রাজশহী বিভাগীয় আমির জুয়েল আলী ওরফে মাহমুদসহ চার জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে শাহজাদপুরে জঙ্গিদের অবস্থান সম্পর্কে জানা যায়। সেই সূত্র ধরেই ভোর ৫টায় অভিযান শুরু করা হয়। প্রথমে জঙ্গিরা র্যাবকে উদ্দেশ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করে। হতাহত হওয়া ঠেকাতে কৌশল পরিবর্তন করে বাড়িটি ঘিরে রেখে তাদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হয়। দীর্ঘ চেষ্টার পরে তারা আত্মসমর্পণ করে। এ সময় ঐ বাড়ি থেকে তাদের সাংগঠনিক বই, দুটি বিদেশি পিস্তল, গান পাউডার, বোমা তৈরির সরঞ্জাম ও পতাকা উদ্ধার করা হয়েছে।
র্যাব-১২-এর কোম্পানি কমান্ডার মিরাজউদ্দিন জানান, চলতি মাসের ৫ তারিখে ছাত্র পরিচয়ে ঐ বাড়িটি ভাড়া নেওয়া হয়। সেখানে জঙ্গি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম চলছে এমন সংবাদের ভিত্তিতে গতকাল ভোরে বাড়িটি ঘিরে ফেলে। এরই মধ্যে র্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে ঐ বাড়ির ভেতর থেকে চার-পাঁচ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। তবে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। হ্যান্ডমাইকে র্যাবের পক্ষ থেকে জঙ্গিদের আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়। বেলা ১১টার দিকে জঙ্গিরা আত্মসমর্পণ করে। আটককৃতদের র্যাব সদর দপ্তরে নেওয়া হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের শাহজাদপুর থানায় হস্তান্তর করা হবে।
এদিকে শেরখালীতে জঙ্গি গোষ্ঠীর অবস্থানের খবর জানতে পেরে ঘটনাস্থলে উত্সুক জনতার ভিড় জমে যায়। স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শাহজাদপুরে এর আগে জঙ্গি ছিল না। হঠাত্ করে জঙ্গিদের অবস্থান আমাদের আতঙ্কিত করে তুলেছে।
স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী জানান, বৃহস্পতিবার রাতে রাজশাহীর শাহ মখদুম থানা এলাকা থেকে নব্য জেএমবির আমির মাহবুবসহ চার জনকে আটক করে র্যাব-৫। মাহবুবের তথ্যের ভিত্তিতে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার ঐ জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালানো হয়।
আটক দুজনের বাড়ি সাঁথিয়ায়
সাঁথিয়া (পাবনা) সংবাদদাতা জানান, শাহজাদপুরে জঙ্গি সন্দেহে আত্মসমর্পণ করা চার জনের মধ্যে দুজনের বাড়ি পাবনার সাঁথিয়া উপজেলায়। এরা হলেন—উপজেলার নন্দনপুর ইউনিয়নের দাড়ামুদা গ্রামের আবু তালেবের ছেলে নাইমুল ইসলাম ও মোখলেছুর রহমানের ছেলে কিরণ ওরফে হামিম ওরফে শামীম। স্থানীয় খোয়াজউদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. সিরাজউদ্দৌলা জানান, নাইমুল ও কিরণ দুজনই তার প্রতিষ্ঠান থেকে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। নাইমুল জোড়গাছা ডিগ্রি কলেজে বিএ ক্লাসে এবং কিরণ একই কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে পড়ছে। তিনি জানান, দুজনেই এলাকায় ধার্মিক ও বিনয়ী ছেলে হিসেবে পরিচিত এবং দুজনেই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। এর মধ্যে নাইমুলের বাবা ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে সংসার চালান। অন্যদিকে কিরণের মা দর্জির কাজ করেন এবং বাবা ছোট একটি দোকান চালান।
এ ব্যাপারে নন্দনপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম লিটন জানান, পুলিশের কাছ থেকে ঐ দুজনের নাম ও ঠিকানা তিনি জেনেছেন। তিনি বলেন, তারা দুজনই আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য। বছর দু-এক আগে রাজশাহী থেকে এক হুজুর এসেছিল। তারা দুজনই তার মুরিদ হন। সেই হুজুর এখন জেলে রয়েছে বলে তিনি জানান।
এ ব্যাপারে সাঁথিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘ঐ দুজন সম্পর্কে আমরা খোঁজ নিয়েছি। তাদের নামে থানায় কোনো মামলা নেই।’