বিবিসি
পাকিস্তানের শক্তিধর সামরিক বাহিনীর সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হিসেবে অনেকের কথা মনে হতে পারে। কিন্তু একজন বিচারপতির নাম হয়তো কারোরই ভাবনায় আসবে না। কিন্তু বিচারপতি ওয়াকার আহমদ শেঠ ছিলেন তেমনি একজন দুর্লভ ব্যক্তিত্ব, যেমনটা পাকিস্তানে খুব বেশি দেখা যায়নি। সম্প্রতি মাত্র ৫৯ বছর বয়সে করোনা ভাইরাস সংক্রমণে মারা যাবার পর তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে অনেকেই ‘স্পষ্টবাদী’, ‘সাহসী’ এবং ‘স্বাধীনচেতা’—এই শব্দগুলো ব্যবহার করেছেন।
ওয়াকার আহমদ শেঠ ছিলেন পেশাওয়ার হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি। তিনি এমন অনেক রায় দিয়েছেন, যা পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও সরকার উভয়কেই ক্ষিপ্ত করেছে। দেশটির নির্বাসিত সাবেক সামরিক শাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফকে তিনি মৃত্যুদণ্ডের যে রায় দিয়েছিলেন, তা সারা পৃথিবীতে আলোচিত হয়েছিল। মানবাধিকার লংঘন নিয়েও পাকিস্তানের এস্টাব্লিশমেন্টকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন তিনি। দেশটিতে একটি আইন ছিল, যা ব্যবহার করে সামরিক বাহিনী গোপন বন্দিশিবির চালাত। বিচারপতি শেঠ সেই আইনটি বাতিল করে দিয়েছিলেন। একটি সন্ত্রাস দমন আইন ছিল, যার অধীনে বহু লোককে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। বিচারপতি শেঠ সেই সব বন্দিকে আটকে রাখার পক্ষে কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই, এ যুক্তি দেখিয়ে খালাস দিয়েছিলেন।
ওয়াকার আহমদ শেঠ ছিলেন মনেপ্রাণে একজন সমাজতন্ত্রী। তিনি ছাত্রজীবনে বামঘেঁষা পাকিস্তান পিপলস পার্টির ছাত্র সংগঠনে সক্রিয় ছিলেন। তার নিজের ওকালতির দপ্তরে টাঙিয়ে রাখতেন কার্ল মার্ক্স, ভ্লাদিমির লেনিন আর লিও ট্রটস্কির ছবি। তবে হাইকোর্ট বারে থাকার সময় তিনি রাজনীতিতে জড়াননি। তার ঘনিষ্ঠ আইনজীবী শাহনওয়াজ খান বলেন, ‘মক্কেল ফি দিতে পারলে যখন অন্য আইনজীবীরা যে কোনো মামলা নিতেন, তখন তিনি বেছে বেছে মামলা নিতেন। বিচারপতি শেঠকে আইনজীবী হিসেবে অনেকে মনে রাখবেন, যিনি অনেক মামলা ফি ছাড়াই করে দিতেন।’
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর প্রভাব আবার বাড়তে শুরু করেছে। ঠিক এমন সময় গত ১৩ নভেম্বর ইসলামাবাদের এক হাসপাতালে বিচারপতি শেঠের মৃত্যুকে অনেকেই দেখছেন এক বড় আঘাত হিসেবে। পাকিস্তানের স্বাধীন মানবাধিকার কমিশনের মহাসচিব হারিস খালিক বলেন, বিচারপতি শেঠের মৃত্যু বিচার বিভাগের জন্য এক বিরাট আঘাত। সুপ্রিম কোর্ট বার সমিতির সভাপতি আবদুল লতিফ আফ্রিদি তাকে একজন সাহসী ও আপোষহীন ব্যক্তি বলে বর্ণনা করে বলেন, তিনি পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর মোকাবিলা করতে পিছপা হননি। এজন্য তাকে ব্যক্তিগতভাবে মূল্যও দিতে হয়েছ। সিনিয়র হওয়া সত্ত্বেও তাকে তিনবার সুপ্রিম কোর্টে প্রমোশন দেওয়া হয়নি।