করোনার টিকা আগাম কিনতে প্রতিযোগিতায় ধনী দেশগুলো

করোনা মহামারিতে (কোভিড-১৯) বিপর্যস্ত বিশ্ব। এখন পর্যন্ত সাড়ে ৫ কোটির বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন, মৃত্যু হয়েছে ১৩ লাখের বেশি। অনেকেই মনে করছেন, একটি টিকা এই মহামারির অবসান ঘটাতে পারে। কিন্তু বাজারে আসার আগেই করোনার টিকা আগাম কিনতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে ধনী দেশগুলো। এ কারণে অনেকের আশঙ্কা গরিব দেশ এই টিকা না-ও পেতে পারে। খবর :বিবিসির।

এখন পর্যন্ত দুটি টিকা ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় খুবই কার্যকর বলে দাবি করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি ফাইজারের সঙ্গে জার্মান কোম্পানি বায়োএনটেক যে টিকার উদ্ভাবন করেছে তা ৯৫ শতাংশ কার্যকর। ইতিমধ্যে তারা মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) কাছে ভ্যাকসিনের জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন চেয়ে আবেদন করেছে। আরেক মার্কিন কোম্পানি মর্ডানার ভ্যাকসিনও ৯৫ শতাংশ কার্যকর। আরো অনেক কোম্পানির টিকা উদ্ভাবনের কাজ এগিয়ে চলছে।  এসব টিকা এখনো অনুমোদন পায়নি। তার পরও আগাম কেনা বন্ধ নেই অনেক দেশের। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনার ডিউক ইউনিভার্সিটি বলেছে, এখন পর্যন্ত ভ্যাকসিনের ৬৪০ কোটি ডোজ আগাম কেনা হয়ে গেছে। এছাড়া আরো ৩২০ কোটি ডোজ কেনা নিয়ে হয়তো আলোচনা চলছে অথবা বিদ্যমান চুক্তিতে সম্প্রসারণের প্রস্তাব রয়েছে।

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের হেলথ পলিসির অধ্যাপক ক্লেয়ার ওয়েনহাম বলেন, ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে আগাম ওষুধ কেনার প্রচলন আগে থেকেই রয়েছে। যাতে করে তারা পণ্য উত্পাদনে তহবিল জোগাড় করতে পারে। এক্ষেত্রে যারা বেশি অর্থ শুরুতে দেয় পণ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা প্রথম সারিতে থাকে। ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বলছে, টিকার জন্য এসব ওষুধ কোম্পানিতে সবচেয়ে বেশি অর্থ দিয়েছে উচ্চ-আয়ের ধনী দেশগুলো। মধ্যম আয়ের কিছু দেশও উত্পাদন সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে টিকা কেনার চুক্তি করতে পেরেছে। কিছু দেশে এসব টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালও হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া চীনের সঙ্গে এবং ব্রাজিল অক্সফোর্ডের সঙ্গে অংশীদার হিসেবে কাজ করেছে।

কোন কোম্পানির টিকা কার্যকর হবে—সেটা কেউই জানে না। তবে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, ভারত এবং কানাডা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি পরিমাণ ডোজ পেতে চুক্তি করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলেছে, এটি সহজেই বোধগম্য যে, প্রতিটি দেশের সরকার তাদের জনগণকে সবার আগে রক্ষার চেষ্টা করবে। তবে এই বৈশ্বিক মহামারি মোকাবিলায় অবশ্যই সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।

ডিউক এনালাইসিসের আন্দ্রিয়া টেইলর বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় ধনী দেশগুলো টিকা পাবে, আর গরিব দেশগুলোর পাওয়ার সম্ভাবনা কম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমরা জানি না যে, কত টিকা কখন বাজারে আসবে। চুক্তি এখনো হচ্ছে কিন্তু বিতরণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। ‘টিল উই উইন : ইন্ডিয়া’স ফাইট অ্যাগেইনিস্ট দ্য কোভিড-১৯ প্যানডেমিক’ বইয়ের সহ-লেখক চন্দ্রকান্ত লহরিয়া বলছেন, গরিব দেশগুলোর টিকা পাওয়ার সম্ভাবনা নির্ভর করছে কতগুলো টিকা উদ্ভাবিত হবে এবং কত দ্রুত তারা উত্পাদন করতে পারবে তার ওপর।

সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট থিংক ট্যাংকের নীতি বিশ্লেষক রেচেল সিলভারম্যান বলছেন, সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল কোম্পানিগুলোর টিকা কেনার ব্যাপারে আগেই চুক্তি হয়ে গেছে। ফাইজার ও মডার্নার মতো কোম্পানি গরিব দেশের জন্য টিকা বানাবে—এমন সম্ভাবনা এখন পর্যন্ত নেই। ফাইজার আশা করছে, চলতি বছরে ৫ কোটি ডোজ এবং ২০২১ সালে ১৩০ কোটি উত্পাদন করবে। প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য দুই ডোজ লাগবে। এই হিসাব করলে বোঝা যাবে টিকা কোথায় যাবে। মডার্নার ভ্যাকসিন ঠান্ডা অবস্থায় রাখতে হবে। এটি অনেক গরিব দেশের জন্য চ্যালেঞ্জের হবে। বিশেষ করে, যেসব দেশে গরম বেশি এবং বিদ্যুতের সক্ষমতা কম।

২০০৯ সালে সোয়াইন ফ্লুর টিকা সরবরাহের ক্ষেত্রে ধনী দেশের আগাম কেনার চুক্তি বড় প্রভাব রেখেছিল। বিশ্বের ৯০ শতাংশ ওষুধ কোম্পানি ১০ শতাংশ মানুষের জন্য পণ্য সরবরাহ করে। বৈশ্বিক ভ্যাকসিন পরিকল্পনা ‘কোভ্যাক্স’ করোনার টিকার সমবণ্টনের জন্য কাজ করছে। তারা অনেক কোম্পানির সঙ্গে টিকা কেনার চুক্তি করেছে। তবে ফাইজার কোভ্যাক্সের সঙ্গে কোনো চুক্তি করেনি।

এ অবস্থায় বিশ্লেষকরা বলছেন, আমরা তখনই নিরাপদ হবো যখন সবাই নিরাপদ হবে। ধনী-গরিব সব দেশ যেন টিকা পায় সেটা নিশ্চিত করতে আরো কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও অক্সফ্যাম। কারণ অল্প পরিমাণ টিকা উত্পাদিত হলে তা পাওয়ার ক্ষেত্রে ধনী দেশই এগিয়ে থাকবে।