নারীরা কোথাও নিরাপদ নয়

বিশ্বের প্রতিটি ধর্মই নারীকে সম্মান করে এবং ধর্ষণের মতো জঘন্যতম অপরাধকে ঘৃণ্য দৃষ্টিতে দেখে থাকে। যেমন—ইসলাম ধর্মে ধর্ষণকে ‘জিনা-বিল-ইকরাহ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।

ধর্ষণ শুধু একটি আইনি অপরাধই নয় বরং মানবজীবনে এর বহু পরিণতি রয়েছে, যা কেবল কোনো শারীরিক ক্ষতি বা আঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে বরং স্থায়ী মানসিক আঘাতেরও সৃষ্টি করে থাকে। সম্প্রতি দেশব্যাপী ধর্ষণ রোধে বাংলাদেশ সরকার ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছে। কিন্তু মনে প্রশ্ন থেকেই যায়, শুধু কঠোর শাস্তি দিয়েই কি এমন জঘন্য অপরাধ আদৌ রোধ করা সম্ভব হবে?

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ধর্ষণের স্বীকার হয় ৮১৮ জন নারী, ২০১৮ সালে হয় ৭৩২ জন এবং ২০১৯ সালে এ সংখ্যা বেড়ে গিয়ে হয় ১ হাজার ৭৩২ জন।

আর ২০২০ সালে দীর্ঘদিন লকডাউন থাকার পরও ধর্ষণ তুলনামূলক হ্রাস পাওয়ার পরিবর্তে আশ্চর্যজনকভাবে কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ধর্ষণ থেকে কোনো শ্রেণি, বয়স, কোনো ধর্মের নারীই বাদ যাচ্ছে না এবং এই অপরাধীদের বেশির ভাগই হলো আত্মীয়, বন্ধু, পরিচিত, প্রতিবেশী যারা ভুক্তভোগীকে চেনেন, যার কারণে অধিকাংশ সময় এসব ঘটনার পর অভিযোগ করা হয় না। এমনকি নির্যাতিতের পিতা-মাতার মতো প্রিয়জনরাও অভিযোগ দায়ের করতে নিরুত্সাহিত করে থাকেন। অনেক ঘটনায় সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে মামলাগুলোর প্রতিবেদন অস্বীকারের মতো অবস্থাও সৃষ্টি হয়। তাদের ধারণা, মামলা করলে যা হয়েছে তা ঠিক করা সম্ভব নয় বরং সবাই জানতে পারলে ভুক্তভোগী ও তার পরিবার নানা ঝামেলার শিকার হবে। এছাড়া আমাদের দেশের মামলার বিচারকার্যের দীর্ঘসূত্রতা সম্পর্কে সবাই ভালোভাবেই অবগত থাকে।

সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও আমরা এখনো এমন সমাজে বেড়ে উঠছি, যেখানে মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এখন আর ধর্ষণকারীর মনে কোনো ধরনের ভয় সৃষ্টি হতে দেখা যায় না আর তারা অবাধে এ ধরনের অপরাধ করতে থাকে ধারাবাহিকভাবে। দুর্বল সামাজিকীকরণের এ সমস্যার কারণে পরিবারও অনেকাংশে দায়ী। পিতামাতা তাদের মেয়েদের জীবনাচরণ নিয়ে যতটা সচেতন, ছেলেদের ক্ষেত্রে ততটা নয়। পিতামাতার উচিত, মেয়েদের পাশাপাশি তাদের ছেলেসন্তানটি তার ব্যক্তিগত জীবনে কী করছে, সে তার সময় কোথায় ব্যয় করছে, কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কি না ইত্যাদি বিষয়ে খেয়াল রাখা। সন্তানদের সঠিক পারিবারিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত করা হলে এ ধরনের প্রকট সামাজিক সমস্যা হ্রাস করা সম্ভব হবে।

ধর্ষণসংক্রান্ত আইনটি প্রতিটি সুশীল সমাজে শতাব্দীর পর শতাব্দী পরিবর্তিত হয়ে আসছে, তবে এই আইনের সূত্রটির একটি অন্যতম মর্মার্থ হলো, পুরুষদের তুলনায় নারীর নিকৃষ্টতা ও অসহায়ত্ব। ধর্ষণ একটি সর্বাধিক অপ্রতিবেদিত অপরাধ বলে ধর্ষণের ঘটনা প্রমাণ করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই ধর্ষণের কারণে একজন নারী অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভাবস্থা, যৌন সংক্রমণজনিত রোগ, ঘুমের অনিয়ম, খাওয়ার ব্যাধি এবং অন্যান্য মানসিক ও শারীরিক অক্ষমতার মতো অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয়।

এই জঘন্য অপরাধ নির্মূলে সরকারের পাশাপাশি জনগণের দায়িত্ব হলো, তার আশপাশের পরিবেশকে নিরাপদ, সুদৃঢ় রাখা এবং  উদার দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা পরিবেষ্টিত করার মাধ্যমে এর প্রতিরোধ করা। বাংলাদেশ ও ভারতের মতো অনেক দেশে এখনো ধর্ষিতা নারীকেই দিনের পর দিন নিজের ধর্ষণের শাস্তি ভোগ করতে হয়। তাই ধর্ষণ সংঘটিত হওয়ার পর ভুক্তভোগীকে সামাজিক কলঙ্ক হিসেবে অপবাদ দেওয়া বন্ধ করার পাশাপাশি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনতে হবে এবং অপরাধীর পাশাপাশি ভুক্তভোগীও যেন সমাজের প্রভাবে কখনো শাস্তির শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই, ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধে আমাদের দেশের আইন যেমন কঠিন, তেমনি এর সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিতেও সবার সোচ্চার হওয়া এখন শুধু সময়ের দাবি।

n লেখক :শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ,

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়