ওয়াসায় পানি সরবরাহ বাড়লেও সিস্টেম লসের নামে পানি চুরিও বাড়ছে। চলছে মিটার টেম্পারিং করে বিল কমানো। নষ্ট মিটারে গড়ে বিল করার পর বিলে টাকার পরিমাণ কম হচ্ছে। এছাড়া গ্রাহক পর্যায়ে অনাদায়ী বিল ক্রমশ বাড়ছে। প্রতি মাসেই প্রচুর বিল অনাদায়ী থেকে যাচ্ছে। বর্তমানে বকেয়া ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। জানা যায়, বর্তমানে ওয়াসায় প্রায় ৭২ হাজার পানির সংযোগ রয়েছে। মিটার নষ্ট থাকায় সাড়ে ৯ হাজার সংযোগের গড় বিল হচ্ছে। ওয়াসা সূত্র জানায়, ওয়াসায় পানি চুরির কারণ ও মিটারবিহীন গ্রাহকদের কেন বিল হচ্ছে, তা নির্ণয়ে অনুসন্ধানী কার্যক্রম শুরু করেছে। প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার নেতৃত্বে গঠিত কমিটি সরেজমিনে কারণ চিহ্নিত করবে।
ওয়াসার রাজস্ব বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে একটি দুষ্টচক্রের হাতে জিম্মি রয়েছে। অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণ চিহ্নিত করতে ওয়াসা পরিচালনা বোর্ড এক সদস্যকে প্রধান করে কমিটি করেছিল। কিন্তু কমিটির কোনো কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না। কমিটির সদস্যরাও নিষ্ক্রিয়। এখন নতুন আরেকটি কমিটির কথা শোনা যাচ্ছে। ওয়াসার আয়ের প্রধান উত্স পানির বিল বাবদ আয়। কিন্তু পানির বিল আদায় নিয়ে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি হচ্ছে। সরবরাহ করা পানির সঠিক বিল ওয়াসা পাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওয়াসার গ্রাহক পর্যায়ে বসানো মিটারগুলো টেম্পারিং করে রিডিং কমানোর সুযোগ রয়েছে। ওয়াসার রাজস্ব শাখার কতিপয় রাজস্ব কর্মকর্তা ও মিটার রিডার টেম্পারিং করে বিল কমানোর প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অকারণে মিটার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পরে নষ্ট মিটারে গড় বিল করে গ্রাহক থেকে আর্থিক সুবিধা আদায় করা হচ্ছে। মিটার রিডার পদে জনবলের অনেক পদ শূন্য ছিল। জনবল নিয়োগ বন্ধ থাকার সময় সহকারী পাম্প অপারেটর পদের কিছু লোককে মিটার রিডারের শূন্য পদে পদায়ন করা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে শূন্য পদে লোক নিয়োগে প্রচণ্ড বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে ওয়াসা কর্তৃপক্ষকে। এখনো পাম্প অপারেটরদের মধ্যে যাদের মিটার রিডারে পদায়ন করা হয়েছিল, তারা বহাল রয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে সরবরাহ করা পানির মধ্যে ২৬-২৭ শতাংশের বিল ওয়াসা পাচ্ছে না। এসব পানি সিস্টেম লসের হিসাবে দেখানো হচ্ছে। হিসাবমতে, সিস্টেম লসের কারণে মাসে প্রায় আড়াই কোটি টাকা ওয়াসা রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জানতে চাইলে ওয়াসার বাণিজ্যিক কর্মকর্তা আবু সাফায়েত মোহাম্মদ সাহেদুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, সিস্টেম লস ও মিটারবিহীন গ্রাহক থেকে গড় বিল নিয়ে কারণ চিহ্নিত করতে একটি কমিটি করা হয়েছে। তারা মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শন করে কারণ চিহ্নিত করবেন। বকেয়া বিল আদায়ে জোর দেওয়া হচ্ছে। আমরা গ্রাহকদের আর এনালগ মিটার দিচ্ছি না। ডিজিটাল মিটার বসানোর প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।’ রাজস্ব বিভাগের অপর এক কর্মকর্তা জানান, বকেয়ার মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এখন বকেয়া প্রায় ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমি এতদিন প্রজেক্ট নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। রাজস্ব বিভাগে বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসের লোক রয়েছে। তারা বিষয়টি দেখেন। এখন আমি মিটিং করে সিস্টেম লসের কারণ ও বিল আদায় নিয়ে অনিয়মগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করতে বলেছি। আগামী জানুয়ারি থেকে আমি মাঠ পর্যায়ে প্রতিটি জায়গায় গিয়ে পরিদর্শন করব।’
এদিকে এনালগের পরিবর্তে ডিজিটাল মিটার স্থাপন নিয়ে প্রকল্প গ্রহণ করেছে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রাম ওয়াসা সর্বপ্রথম এই প্রকল্প গ্রহণ করেছে। প্রথম পর্যায়ে নগরীর চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায় মিটার স্থাপন করা হবে। এতে প্রায় ৩ হাজার গ্রাহক ডিজিটাল মিটারের আওতায় আনা হবে। জানা যায়, গ্রাহক পর্যায়ে বসানো মিটার থেকে সফটওয়্যারের মাধ্যমে রিডিং কালেকশন করে বিল তৈরি করা হবে। এই প্রক্রিয়ায় শুধু মিটার থেকে রিডিংই নয়, পাইপলাইনে লিকেজ ও গ্রাহক পানি না পেলে সার্ভারের মাধ্যমে জানা যাবে।
ডিজিটাল প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ওয়াসার রাজস্ব কর্মকর্তা ইরফান সাজ্জাদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা কয়েকটি প্রাইভেট কোম্পানি থেকে প্রকল্প বাস্তবায়নে কোটেশন নিয়েছি। তাদের মধ্য থেকে একটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হবে। বিশ্বে এটি একটি নতুন পদ্ধতি। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে ওয়াসার রাজস্ব আদায় ও পানির বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়ম বন্ধ হবে।