নিশাচর পাখি পেঁচাকে নিয়ে মানুষের মাঝে নানা কুসংস্কার এবং অলৌকিক চিন্তাভাবনা থাকলেও উপকারী হিসেবে পৃথিবীজুড়েই এর সুনাম আছে। পেঁচা প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পৃথিবীতে প্রায় ২০০ প্রজাতির পেঁচা দেখা গেলেও বাংলাদেশে রয়েছে ১৬ প্রজাতির পেঁচা। এর মধ্যে আছে লক্ষ্মী পেঁচা, কোটরে পেঁচা, নিম পেঁচা, কুপোখ বা কালো পেঁচা, ভুতম পেঁচা, পাহাড়ি পেঁচা, ঘাসবনের পেঁচা, ভুমা পেঁচা, বন্ধনীযুক্ত নিমপোখ পেঁচা, বনের বড় পেঁচা। খাবার নিয়ে পেঁচার তেমন বাছবিচার নেই—ছোট ইঁদুর, শুঁয়োপোকা, ছোট পাখি, টিকটিকি, ঢোঁড়া সাপ, ব্যাঙ ইত্যাদি খায়।
পেঁচা পাখিদের দলের হলেও এরা অন্যান্য পাখির সঙ্গে একত্রে না থেকে একাকী নির্জনে বড় গাছের কোটর, বন-জঙ্গল, দালানের ফাঁকফোকর কিংবা গাছগাছালির ঘন পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে। দিনের বেলা সহজে চোখে পড়ে না। দিনের বেলা এরা বিশ্রাম নেয়। অনেকে মনে করে পেঁচা দিনের বেলা দেখতে পায় না। এটি এক ধরনের ভুল ধারণা। পেঁচা দিনের বেলা দেখতে পায়। তবে এদের বড় আইরিশযুক্ত চোখের কারণে রাতে এদের দেখতে বেশি সুবিধা হয়।
পেঁচার ডাক খানিকটা ভিন্ন রকমের। নিশাচর স্বভাবের কারণে পেঁচাকে অনেকেই অশুভ পাখি বলে মনে করে থাকে। বিভিন্ন দেশে পেঁচাকে নিয়ে কিছু বিশ্বাস-অবিশ্বাস রয়েছে। যেমন ভারতের কোনো কোনো এলাকায় পেঁচাকে বাদুড়ের স্ত্রী হিসেবে বিশ্বাস করা হয়। প্রাচীনকালে উত্তর ভারতের মানুষেরা বিশ্বাস করত যে, কেউ যদি পেঁচার চোখ খেয়ে নেয় তবে সে রাত্রে ভালো দেখতে পাবে। এমনকি বাতের ব্যথা সারাতে ও হজমের ওষুধ হিসেবে পেঁচার মাংস ব্যবহার করা হতো। কালো রঙের পেঁচাকে মৃত্যুর প্রতীক হিসাবে ধরা হতো সেখানে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে যাওয়ার আগে রাস্তায় পেঁচা দেখা গেলে ধরেই নেওয়া হতো সেই যুদ্ধের ফল হবে রক্তাক্ত। জাপানের এইনু সম্প্রদায় যে কোনো অভিযানে যাওয়ার আগে পেঁচাকে বিশেষ মদ উত্সর্গ করত—এর ফলে কোনো বিপদ হলে তারা সেই বিপদ থেকে রক্ষা পাবে। কেনিয়ার কিকুয়ু উপজাতির বিশ্বাস, পেঁচা মৃত্যুর কথা জানিয়ে দেয়। যদি কেউ একটি পেঁচা দেখে কিংবা তার আওয়াজ শোনে তাহলে তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। মধ্য আফ্রিকার বানটু জাতির কাছে জাদুকরের প্রতীক পেঁচা এবং দক্ষিণ আফ্রিকার জুলুক জাতির কাছে পেঁচা একটি জাদুকরী পাখি। অস্ট্রেলিয়ায় আদিবাসীদের বিশ্বাস—বাদুড় পুরুষ আত্মার বাহক আর পেঁচা নারী আত্মার বাহক। পোল্যান্ডে ধারণা করা হতো, মৃত্যুর পর অবিবাহিত নারীরা কবুতর হয় ও বিবাহিত নারীরা পেঁচা হয়ে জন্ম নেয়। জার্মানিতে বিশ্বাস করা হতো, যদি সন্তান জন্মের সময় পেঁচা ডাকে তবে সেই সন্তানের ভাগ্য ভালো হয় না। ফ্রান্সে বিশ্বাস করা হতো, অন্তঃসত্ত্বা নারী পেঁচার ডাক শুনলে তার কন্যাসন্তান হবে। স্পেনে প্রাচীনকালে মানুষের বিশ্বাস ছিল যে, যিশুর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পেঁচা সুরেলা পাখি ছিল, এরপর এক রাতে ডাকার সময় পেঁচার ডাক বদলে গেছে।
পেঁচাকে মন্দ ভাগ্য, শারীরিক অসুস্থতা অথবা মৃত্যুর প্রতিচ্ছবি হিসেবে গণ্য করা হয়—প্রাচীনকালের এই বিশ্বাস এখনো প্রচলিত। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে বিশ্বাস আছে যে, রাতে পেঁচা ডাকলে নাকি গৃহস্থের অমঙ্গল হয়। কিন্তু রাতে পেঁচা ইঁদুর ধরতে মাটিতে নেমে আসে ও ডাকে। তাই গভীর রাতে পেঁচার ডাক শুনতে পাওয়াটা অতি সাধারণ ও স্বাভাবিক একটি ব্যাপার।
এভাবেই পেঁচা বিভিন্ন কুসংস্কার এবং অলৌকিক চিন্তাভাবনা সঙ্গে নিয়েই প্রকৃতি ও পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছে।