মাধ্যমিক স্তরের মতো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীকে এবার পরীক্ষা ছাড়াই পরের ক্লাসে উত্তীর্ণ করা হবে। যার যে রোল নম্বর আছে, সেই রোল নম্বর নিয়েই পরের শ্রেণিতে উঠবে তারা। চলতি বছরের ১৬ মার্চ পর্যন্ত শ্রেণিকক্ষের পড়াশোনা এবং কোভিড-১৯-এর সময় যেসব শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হয়েছে, সেগুলোর ভিত্তিতে তাদের মূল্যায়ন করা হবে। তবে মূল্যায়ন করা হলেও পরের শ্রেণিতে ওঠার ক্ষেত্রে তার কোনো প্রভাব পড়বে না। গণমাধ্যমকে এমন তথ্যই দেওয়া হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে।
এদিকে মাঠ পর্যায়ে পাঠানো প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলমগীর মুহম্মদ মনসুরুল আলম স্বাক্ষরিত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ‘কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের প্রাক্কালে ১৬ মার্চ পর্যন্ত বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পাঠদান চলমান ছিল। পরবর্তী সময়ে কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের শিখন কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে সংসদ টিভি, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার, কমিউনিটি রেডিওর মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সম্পৃক্ত ছিলেন। এ প্রেক্ষাপটে শিক্ষকদেরকে নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হলো।’ এই নির্দেশনার চিঠি প্রাথমিক শিক্ষার সব বিভাগীয় উপপরিচালক, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, উপজেলা/থানা শিক্ষা অফিসার, সহকারী উপজেলা/থানা শিক্ষা অফিসার এবং প্রধান শিক্ষকদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলমগীর মুহম্মদ মনসুরুল আলম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের ১৬ মার্চ পর্যন্ত ক্লাস হয়েছে। সেই সময় তাদের ক্লাস টেস্ট নেওয়া হয়েছে, শিক্ষকরা পড়িয়েছেন, সেসব মূল্যায়নে আনা হবে। করোনা ভাইরাস মহামারিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি থাকলেও সংসদ টেলিভিশন, বেতার, কমিউনিটি রেডিও এবং জুম প্ল্যাটফরমে যেসব শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে, সেগুলোও মূল্যায়ন করা হবে। এছাড়া ছুটির মধ্যেও অনেক শিক্ষক শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়া দিয়ে পড়া আদায় করেছেন, সেসবও তারা মূল্যায়নে আনবেন। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন, যার তথ্য-উপাত্ত শিক্ষকদের কাছে রয়েছে, সেসবও মূল্যায়নে আনা হবে।
তবে এই নির্দেশনা নিয়ে মাঠপর্যায়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। মূল্যায়নের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হলেও কোন প্রক্রিয়ায় কোন কোন বিষয় মূল্যায়নে থাকবে সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকার নিকটবর্তী এক উপজেলার শিক্ষা অফিসার জানান, নির্দেশনা পেয়েছি, মূল্যায়ন করতে হবে। কিন্তু কীভাবে করা হবে সে বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি। এ কারণে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, মার্চ পর্যন্ত স্কুলগুলোতে ঠিকমতো ক্লাস হয়নি। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্নভাবে অনেকগুলো কার্যদিবস শেষ হয়েছে। করোনার কারণে শিক্ষার্থীদের স্কুলেও আনা যাবে না। বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগও নেই। গ্রামে টেলিভিশন অনেক বাড়িতেই নেই। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার কারণে টেলিভিশন থাকলেও ‘সংসদ টিভি’ দেখার সুযোগও ছিল না।
আরেক শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, জুম প্ল্যাটফরম বা অনলাইনে অংশগ্রহণ করার মতো সুযোগও ছিল না প্রাইমারির শিক্ষক শিক্ষার্থীদের। ফলে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন সম্ভব হবে কীভাবে? আর কোন প্রক্রিয়াই বা মূল্যায়ন হবে।
সালমা বেগম নামে এক প্রাথমিক শিক্ষক বলেন, করোনার পর থেকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ। কীভাবে কতটুকু লেখাপড়া করেছে তা অভিভাবক ছাড়া কেউ জানে না।
আজিজুল ইসলাম নামে এক অভিভাবক বলেন, করোনায় বইয়ের কাছে যায়নি শিশুরা। স্কুলের পক্ষ থেকেও কোনো যোগাযোগ করেনি। এখন শুনেছি মূল্যায়ন করবে। কি নিয়ে মূল্যায়ন করবে। এটা নিয়ে আমরাও কিছু বুঝতে পারছি না। মূল্যায়নের নামে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বাড়তি চাপ না দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান তিনি।
বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ বাড়তে শুরু করলে গত ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। কওমি মাদ্রাসা বাদে অন্যসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগামী ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করা আছে।