করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এবং করণীয়

একবিংশ শতাব্দীর এ আধুনিক ডিজিটাল ও বিজ্ঞানের যুগে এসে কোভিড-১৯ নামক রোগটি এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে তা কেউ কোনো দিন ভাবেনি। তবে এটি ঠিক যে এখানেই বিধাতার শক্তি। তিনি যে তার সর্বোত্কৃষ্ট সৃষ্টি মানুষের সবকিছুর ঊর্ধ্বে তা স্মরণ করার সময় এসেছে। যাহোক, গত বছরের (২০১৯) ডিসেম্বর থেকে এ বছরের (২০২০) নভেম্বর মাসের শেষ দিকে এসে দেখা যাচ্ছে সব পরিকল্পনা ও ধারণা সবকিছু পালটে দিয়ে আবারও বেড়ে চলেছে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুর সংখ্যা। এটিকেই সেকেন্ড ওয়েব বা দ্বিতীয় ঢেউ বলে বেশ আগে থেকেই আশঙ্কা করা হচ্ছিল। প্রথম ধাক্কায় সারা বিশ্বে আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ডের ছড়াছড়ি। বর্তমানে সারা বিশ্বে আক্রান্ত প্রায় সাড়ে ৫ কোটি এবং মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ মানুষ। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়।

ভাইরাসটি নতুন হওয়ার কারণে যদিও-বা এটি সম্পর্কে তেমন কোনো গবেষণা তথ্য নেই, তার পরও সাধারণভাবে বলা যায়, শীতকালে এবং শীতপ্রধান দেশে এ ভাইরাসের আক্রমণের ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপ-আমেরিকার দেশসমূহ। পরিসংখ্যান দেখলে তা সহজেই যে কারো কাছেই পরিষ্কার হয়ে যায়। সর্বোচ্চ আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র। তবে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ হিসেবে ভারতও পিছিয়ে নেই। আক্রান্ত ও মৃত্যুর তালিকায় প্রথম দিকেই স্থান করে নিয়েছে দেশটি। সব দেশেই এখন প্রথম পর্যায়ের করোনা আক্রমণ শেষ করে দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশেও তা বাড়ছে আবারও। কারণ দেখা গেছে, প্রথম ঢেউয়ের সময় আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছার পর তা আস্তে আস্তে কমে এসেছিল। কিন্তু তাপমাত্রা কমে শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে করোনা আক্রান্তের ও মৃতের সংখ্যাও আস্তে আস্তে বেড়ে চলেছে।

এই যে দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হলো তাকে প্রতিরোধে আমাদের অনেক কিছুই করণীয় রয়েছে। কারণ প্রথম শুরু হওয়ার সময় এটি নতুন ছিল বলে মোকাবিলার কৌশল কারোরই জানা ছিল না। কিন্তু এর মধ্যেই আমরা করোনাকে নিয়ে প্রায় এক বছর পার করে দিচ্ছি। এখন আমরা অনেক কিছুই শিখে গিয়েছি। আমাদের অভ্যাসের মধ্যে অনেক কিছু রপ্ত হয়ে গিয়েছে। করোনা থেকে স্বাভাবিক জীবন পেতে হলে আমাদের হয়তো আরো অনেক দিন অপেক্ষা করতে হবে। কারণ টিকা কিংবা চিকিত্সা-পদ্ধতি আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে করোনা ভাইরাস নিয়ে সতর্কভাবেই চলতে হবে বলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা। আমরা জানি, ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দেন কিউর’। এজন্যই হয় করোনার টিকা নতুবা চিকিত্সা আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত আমরা মোটেও নিরাপদ নই।

করোনা ভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদের নিয়মতান্ত্রিক সতর্কতার বিকল্প নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক কিছুই শিক্ষণীয় থাকে। সম্প্রতি করোনা সতর্কতায় অন্যতম রক্ষাকবচ হিসেবে মাস্ক পরা নিয়ে একটি পোস্ট ভাইরাল হয়েছে। সেখানে তিনটি অসাবধানতার কথা উল্লেখ করে সে বিষয়ে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।                           

ধারাবাহিক কয়েকটি ছবি দিয়ে সেখানে লেখা রয়েছে, ‘যে প্রচলিত ভুলে করোনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের মধ্যে সেই প্রচলিত তিনটি ভুল হলো—১) এরা আমার সহকর্মী, আমি তাদের সঙ্গে মাস্ক ছাড়াই কথা বলতে পারি, ২) এরা আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু তাদের সঙ্গে মাস্ক ব্যবহার ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার প্রয়োজন নেই এবং ৩) ওনারা আমার আত্মীয়, তাদের সঙ্গে মাস্ক ছাড়াই মেলামেশা করা যায়। আরো বলা হয়েছে—ওপরের তিনটি ভুল করা থেকে বিরত থাকুন, সঠিকভাবে মাস্ক পরুন, নিজে বাঁচুন এবং সমাজকে রক্ষা করুন। কাজেই আমরা দেখেছি একসময় মসজিদসহ ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতেও সীমিত পরিসরে প্রার্থনা করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে মাস্ককে বাধ্যতামূলক করে সেসব স্থানে পুনরায় স্বাভাবিকতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

আমরা স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছি, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো আমাদের বাংলাদেশেও দ্বিতীয় ঢেউয়ের তরঙ্গ প্রতীয়মান হচ্ছে। বিগত এক বছরের অভিজ্ঞতা দিয়ে এখন আগামী দিনে দ্বিতীয়, তৃতীয় ইত্যাদি যত ঢেউই আসুক না কেন, তা সচেতনতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। এটি তো পরিষ্কার যে বিশ্বের অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় আমাদের বাংলাদেশে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা কম। সেটি আমাদের জন্য স্বস্তি বয়ে আনলেও তার আত্মতুষ্টি নিয়ে আমাদের অসতর্কভাবে বসে থাকার সুযোগ নেই। কাজেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া স্লোগান—‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’ মেনে নিয়ে সব মহলে তা প্রতিপালন করে নিজেও সুরক্ষিত থাকি, পরিবার-পরিজন, পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব সবাইকে সুরক্ষিত রেখে গোটা দেশকে সুরক্ষিত করি। কারণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হলে এর বিকল্প নেই।

n লেখক :ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়