দুই হাঁটুতে ভর দিয়ে বসে লাঞ্ছিত শরিফুল বাদামওয়ালাকে বলছিল তার কাহিনি। শরিফুলের ধরাবাঁধা কোনো কাজ নেই, তবে তার একটা পরিচয় নির্দিষ্ট—সে গেছো। সে গাছে উঠে অন্যের ডাব পাড়ে, আমলকি পাড়ে, সুপারি পাড়ে। বিনিময়ে কেউ কখনো টাকা দেয় আবার কখনো ঐ পাড়া জিনিস দেয়—তাই বেচে-টেচে শরিফুলের সামান্য আয়। কষ্টে-সৃষ্টে চলে সংসার। শরিফুল বলে, ‘মায়ের চোখ কাটা (ছানি অপারেশন) হয়েছে। ডাক্তার মায়ের এট্টা ডপ নেকেছে। ডপ কেনার মতো টাকা সারা দিনে হয়নি, তাই গিছিলাম ঐ থানাপাড়ার ঐ দিকি এক বাড়ি; মাঝেমধ্যি ওগের ডাব-টাব পেড়ি দিই। বাড়ির মালিককে গিয়ে বুললাম ভাই কইডা ট্যাকা দেও কাইল দিয়ে দবনে। জানো ভাই টাকা তো দিলই না আরো উলটো ম্যারলো।’ আমি কৌতূহল প্রকাশ করি—কেন মারল কেন? শরিফুল বলল, ‘উই যে কাছে যেয়ে ইট্টু হাত ধরে কইছি। ‘কই শালা সারা দ্যাশ বেরিয়ে এসে হাত ধরলি!’ বলেই মার। ওগের দরকারের সময় তো তেলি তেলি (তোষামোদ) হাত ধরে নিয়ে যায় তকন আমাগের করোনা হয় না, আমাগের দরকারে ওগের হাত ধরলিই ওগের করোনা হয়ি যায় হ্যাঁ।’ আমার দিকে তাকিয়ে সে বলে, ‘হাত ধরা কি অন্যায়?’ আমি চুপ। বাদামওয়ালা বলে, ‘কী আর করবি বল আমাগের উরা দামই দিতি চায় না। তুই আর মন খারাপ করিস নে যা বাড়ি যা। আর আল্লাহর কাছে বিচার দে।’ চলে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালে আমি শরিফুলকে টাকাটা দিই। সে বারবার বলে, আপনার বাড়ি কোথায় আমি টাকাটা দিয়ে দেব। আমি বলি না লাগবে না তারপরও সে বলে এই বাদামওয়ালা চাচার কাছে দিয়ে দেব নে, আপনি নিয়ে নেবেন। টাকাটা দেওয়ার আগে একসময় আমার হাত থেকে বাদামের ঠোঙাটা পড়ে গেলে সে তাড়াতাড়ি করে বাদামগুলো কুড়িয়ে দেয়। এই কথাটা বলার উদ্দেশ্য এই যে টাকাটা পেয়ে সে সন্তুষ্ট হয়ে পড়ে যাওয়া বাদাম তুলে দিয়েছে তা নয়। এতে তার বিনয়ই প্রকাশ পায়। এই ধারণা আরো শক্ত হয় বাদামঅলার মুখে তার সম্পর্কে শোনার পর। এই সরলতার পুরস্কার কি লাঞ্ছনা হতে পারে?
শরিফুলের চলে যাওয়ার সময় একবার তাকালাম তার দিকে। ক্ষীণ ও অপুষ্টিতে ভোগা ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে যাওয়া শরীরে দাসত্বের ছাপ, আনুগত্যের ছাপ, চোখে অসহায়ত্বের ছাপ। ছাপ থাকবেই বা না কেন। শরিফুলদের তো অর্থনৈতিক মুক্তি সামাজিক মুক্তি মানসিক মুক্তি কোনোটাই হয়নি। ফিরে আসার সময় মনে পড়ছিল শরিফুলের প্রশ্ন—হাত ধরা কি অন্যায়? তখন বলতে পারিনি, তবে এখন মনে হচ্ছে না অন্যায় না। তুমি সরল, তুমি বিনয়ী, তুমি অহিংস, তুমি বঞ্চিত ,তুমি মা সেবী, তোমার অন্যায় নয়, অন্যায় ওদের।
সাগর হোসেন
ছাত্র, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়,
কুষ্টিয়া