আগুনে পোড়ে বস্তি পোড়ে ওদের কপাল

আকলিমা আক্তারের বাড়ি ছিল পটুয়াখালীর গলাচিপায়। নদী ভাঙনে সবকিছু হারিয়ে বছর দশেক আগে ঠাঁই নিয়েছিলেন মহাখালীর সাততলা বস্তিতে। সোমবার রাতে পুড়ে গেছে তার সবকিছু। কিছুই বের করতে পারেননি। বস্তি লাগোয়া দোকানের সামনে মাথায় হাত দিয়ে বসে আহাজারি করছিলেন তিনি। এ সময় তাকে ঘিরে ছিলেন আরো অনেক লোকজন। কাছে গিয়ে কত টাকার মালামাল পুড়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শুধু ঘর আর সেলাই মেশিন না, আমার কপালটাই পুড়েছে। এনজিও থাইক্যা লোন করে দোহানে ৫০ হাজার টাকার মাল উডাইছিলাম। পুইড়া সব শ্যাস গো, এহন কি করে খামু, আগুন লাগাই দিছে গো।’   গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিন ঐ বস্তিতে গিয়ে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের সঙ্গে কথা বলে  এমন অনেক আহাজারি চোখে পড়ে। এ সময় বস্তির ইসলাম উদ্দিনসহ আরো কয়েক জন মুরব্বির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ‘প্রতি বছর শীত এলেই বস্তিতে আগুন লাগে। গত পাঁচ বছরে ছয় বার বস্তিতে ছোট বড় আগুন লেগেছে। বেশির ভাগ আগুন পরিকল্পনা কইরা লাগানো হয়।’ এদিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বিহারিপট্টি জহুরী মহল্লার পাশে লাগা আগুনে বস্তির সবগুলো ঘর পুড়ে গেছে। গতকাল বিকালে আগুন লাগার পর দেড় ঘণ্টার চেষ্টায় বিকাল পৌনে ৬টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিস।

গতকাল দুপুর থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, আগুনে সব এলোমেলো। নারী, শিশু, বৃদ্ধ এক কাতারে। মলিন চোখে ফ্যাল ফ্যাল করে এদিক-সেদিক তাকিয়ে থাকছে তারা। পাশেই পোড়াবস্তির ছাই, কাঠ, বাঁশ আর টিন সড়িয়ে নতুন করে ঘড় বাঁধার স্বপ্ন তাদের। এর মধ্যেই পাশে মাইকে জানানো হচ্ছে, ‘এখানে ভিড় না করে যারা বাইরে থেকে এসেছেন চলে যান, সবাই করোনা মাস্ক পরুন। তবে বেশির ভাগ লোকজনের মুখে কোনো মাস্ক চোখে পড়েনি সরেজমিন। এ সময় পাশেই সেবামূলক কাজ করছিল বিভিন্ন এনজিও।

জানতে চাইলে ব্র্যাকের কর্মী শিরিন শিলা বলেন, ‘আগুনে বস্তির অনেক ঘর পুড়েছে। ব্র্যাকের পক্ষ থেকে বস্তিবাসীকে হাঁড়িপাতিলসহ রান্নার সামগ্রী বিতরণ করছেন তারা।’ এর মধ্যে চোখে পড়ে মুখে মাস্ক পরা একজন বস্তির লোকজনের পাশে থেকে বিভিন্ন ধরনের সেবা করছেন। কাছে গিয়ে জানা গেল তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. নাসির। তিনি বলেন, আগুনে বস্তির ১২৭টি ঘরের পাশাপাশি দোকান পুড়েছে ৩৫টি। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ অনেক। তবে দোকানদারদের বেশি ক্ষতি হয়েছে। কারণ তাদের দোকানে ফ্রিজ, টেলিভিশনসহ নগদ টাকা ও মূল্যবান সরঞ্জাম ছিল। তার সব পুড়ে গেছে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান বলেন, সরু পথ ও পানির উেসর অপ্রতুলতার কারণে আগুন নেভাতে বেগ পেতে হয়েছে। আগুন লাগার পরই আগুনের লেলিহান শিখা পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এতে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় চারপাশ। তবে আগুনে কোনো প্রাণহানী হয়নি। 

বস্তির পাশেই সড়ক লাগোয়া পোড়া দোকানে বসে ছিলেন মোহাম্মদ সাগর। আগুনে তার দোকানের ৪০ হাজার টাকার মালামাল পুড়ে গেছে। গতকাল বিকালে সরেজমিন তার দোকানে গিয়ে দেখা যায়, আগুনে পুরো দোকান পুড়ে গেছে। আগুনের সময় তার দোকানের মালমাল লুট হয়েছে দাবি করেন তিনি বলেন, দোকানের মালামাল বিক্রি করে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে তার সংসার চলত। তার মতোই জাহাঙ্গীর আলম নামে অপর এক দোকানির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি গত ১২ বছর ধরে সাততলা বস্তিতে স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন। বস্তির পাশে একটি হাঁড়িপাতিলের দোকানে প্রায় ১৫ লাখ টাকার মালামাল ছিল তার। গত এক যুগ ধরে তিলেতিলে গড়া এই দোকানের সব মালামাল পুড়ে গেছে। এখন তিনি পথের ফকির। তিনি যোগ করেন, ‘১ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে দোকান শুরু করেন।’ নুরজাহান বেগম নামে এক নারী বলেন, বস্তিতে আগুনের আগের দিন এনজিও থেকে ৩০ হাজার টাকা তুলে তার ঘরে রেখেছিলেন তিনি। আগুনে ঘরের পাশাপাশি টাকাও হারিয়েছেন তিনি। এর আগে ২০১২, ২০১৫ ও ২০১৬ সালে আগুনে পুড়েছিল সাততলা বস্তি।

জানা গেছে, গতকাল বিকাল সোয়া ৪টার দিকে জহুরী মহল্লায় অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহজাদী সুলতানা জানান, মোহাম্মদপুরে বাবর রোডের বিহারিপট্টির বস্তিতে সোয়া ৪টার দিকে আগুন লাগে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট সেখানে উপস্থিত হয়। বিকাল পৌনে ৬টার দিকে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত আগুন লাগার কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস।