৫০ বছর আগে ৪১ শতক অর্পিত সম্পত্তির ওপর ডিক্রি পান সুজায়েত আলী খান নামে এক ব্যক্তি। ১৯৭১ সালের ১৫ মার্চ ঐ ব্যক্তির অনুকূলে ডিক্রি দেন যশোরের তৃতীয় মুন্সেফ আদালতের বিচারক সুলতান আহমেদ। পরে মামলাটি হাইকোর্ট থেকে আপিল বিভাগে আসে। তখন শুনানিকালে মামলার নথিপত্র দেখে জালিয়াতির আশঙ্কা করেন সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিরা। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে দেশের সর্বোচ্চ আদালতকে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পর তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। সেই অসহযোগ আন্দোলনের মধ্যে ১৯৭১ সালের ১৫ মার্চ যশোরের তৃতীয় মুন্সেফ আদালত কীভাবে ঐ ব্যক্তির পক্ষে একতরফা ডিক্রি দিলেন তা বোধগম্য নয়। এর পরই যশোরের জেলা জজ আদালতের মহাফেজখানায় এই মামলার নথিপত্র রক্ষিত আছে কিনা সেই বিষয়ে প্রতিবেদন চাওয়া হয়। সেখান থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়, এ সংক্রান্ত মামলার কোনো নথি যশোরের জেলা জজ আদালতের মহাফেজখানায় নেই। এর পরই জালিয়াতির আশঙ্কার বিষয়টি সত্যে পরিণত হয়।
গতকাল মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ এ সংক্রান্ত মামলায় সরকারের আপিল গ্রহণ করে রায় দেয়। এই রায়ের ফলে ৫০ বছর পর ৪১ শতক জমি সরকার ফিরে পেল বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিত দেবনাথ। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে আদালতের সঙ্গে এই প্রতারণা করা হয়েছে। এর সঙ্গে যে চক্রই জড়িত থাকুক না কেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। নইলে সরকারি সম্পত্তি বেহাত হয়ে যাবে।
মামলার নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, যশোরের কোতোয়ালি থানার বকচর মৌজায় ৪১ শতক অর্পিত সম্পত্তি নিজের দাবি করে ১৯৭০ সালের ৩১ ডিসেম্বর সুজায়েত আলী খান নামে এক ব্যক্তি যশোরের তৃতীয় মুন্সেফ আদালতে একটি দেওয়ানি মামলা দায়ের করেন। যার নম্বর: ৫৮৭/৭০। ঐ মামলায় ১৯৭১ সালের ১৫ মার্চ তার পক্ষে একতরফা ডিক্রি হয়। নিম্ন আদালতের এই রায় বাস্তবায়নের নির্দেশনা চেয়ে ২০০৮ সালের ১০ আগস্ট হাইকোর্টে রিট করেন সুজায়েত আলী খানের উত্তরাধিকারী সাদেক আহমেদ নিপুসহ ও অন্যরা। ঐ রিটের রায়ে ২০১০ সালে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ অর্পিত সম্পত্তি থেকে অবমুক্ত করে রিট আবেদনকারীগণকে তা বুঝিয়ে দিতে নির্দেশ দেয়। এর বিরুদ্ধে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। আপিল নম্বর: ১৯০/২০১১।
এই মামলার শুনানিকালে মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করেন আপিল বিভাগের বিচারপতিরা। এর পরই সুজায়েত আলী খানের দায়ের করা মামলার বিষয়ে সঠিক তথ্য চেয়ে যশোর জেলা জজের মহাফেজখানায় চিঠি লিখেন অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন। ঐ চিঠির জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়, অত্র রেকর্ড রুমে রক্ষিত হাইকোর্ট ফরম নং (আর) ৩২ দৃষ্টে দেখা যায়, যশোর ৩য় মুন্সেফ আদালতে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের এক তারিখে ৩টি দেওয়ানি মোকদ্দমা নিষ্পত্তি অন্তে মহাফেজখানায় সংরক্ষণের জন্য রক্ষিত আছে। ঐ মাসে আর কোনো মোকদ্দমা সংশ্লিষ্ট আদালত হতে মহাফেজখানায় সংরক্ষণের জন্য প্রেরণ করা হয় নাই। এর পরই প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ সরকারের আপিল গ্রহণ করে হাইকোর্ট ও মুন্সেফ আদালতের রায় বাতিল করে দেয়। বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা হলেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মো. নূরুজ্জামান ও বিচারপতি ওবায়দুল হাসান।