কী করিয়া ঐক্য ফিরাইবেন বাইডেন?

ঐতিহাসিক ‘থ্যাংকসগিভিং ডে’ ছিল গত বৃহস্পতিবার। দিনটি আরো তাত্পর্যপূর্ণ করিয়া তুলিয়াছে যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ঐক্যের বার্তা। এমনিতেই ‘থ্যাংকসগিভিং ডে’ প্রথাটির মধ্যে দারুণ একটি ঐক্যের গন্ধ রহিয়াছে। ব্রিটেনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ঐক্য ও সৌভ্রাতৃত্বের বার্তা দিতে এই প্রথার সূচনা হইয়াছিল সেই ১৭৭৭ সালে। ঐতিহাসিক এই দিনটিতে বাইডেন বলিয়াছেন যে, বিশ্বাস, সাহস, ত্যাগ, এমনকি দুর্দশার মুখেও দীর্ঘদিন ধরে থ্যাংকসগিভিং ডে আমেরিকার অংশ। এই প্রসঙ্গে স্মরণ করা যাইতে পারে—প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর বিজয়ভাষণে বাইডেন বলিয়াছিলেন যে, নীল (ডেমোক্র্যাট) ও লাল (রিপাবলিকান)-এর মধ্যে বিভাজন মিটাইয়া এইবার তিনি ঐক্যবদ্ধ আমেরিকাকে দেখিতে চাহেন। বাইডেন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলিয়াছেন—কেহ কাহারো শত্রু নহে। গত বুধবারও বাইডেন স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছেন—যন্ত্রণা হইতেই সম্ভাবনা তৈরি হয়। হতাশা জন্ম দেয় অগ্রগতির। আর বিভাজন হইতেই আসে ঐক্য।

কিন্তু তাহা কী উপায়ে? বিশ্বের অনেক বিশ্লেষকের মতে, গত চার বত্সরে একটি অযোগ্য, অহংসর্বস্ব, দুর্নীতিপরায়ণ, বর্ণবিদ্বেষী, নীতিহীন ও মিথ্যাবাদী এক ব্যক্তি ৭ দশমিক ১ কোটি আমেরিকান ভোটারের স্বপ্নের নেতা ছিলেন। কেমন ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির চারটি বত্সর? কোভিড মহামারি মোকাবিলায় ট্রাম্পের ব্যর্থতা তাহাকে শেষ ল্যাপে পিছনে ফেলিয়া দেয়। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রের হইলেও কোভিডে আক্রান্ত হইয়া মোট মৃত্যুর প্রায় ২০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ। মহামারি মোকাবিলা ছাড়াও আমরা দেখিয়াছি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ে বিশ্বব্যাপী আরো অধিক উত্থান ঘটিয়াছে কর্তৃত্ববাদের। ট্রাম্পের সহিত উষ্ণ সম্পর্ক ছিল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের কর্তৃত্ববাদী শাসকদের সহিত। ট্রাম্প দাবি করিতেন তিনি ভালো মধ্যস্থতাকারী। কিন্তু আমরা দেখিয়াছি উত্তর কোরিয়ার সহিত সম্পর্কোন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার পরও ট্রাম্প কার্যত ব্যর্থ। বলা যায়, প্রথাগত রাজনৈতিক কাঠামোর বাহির হইতে উঠিয়া আসা ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ক্রমশ আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক কাঠামোর বাহিরে লইয়া গিয়াছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রকে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি হইতে প্রত্যাহার কিংবা ইরানের সহিত ছয় জাতির চুক্তি হইতে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার, অথবা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হইতে বাহির হইয়া আসা—এমনকি জাতিসংঘেও চার বত্সরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল মলিন। অভিবাসন-নীতি লইয়াও ট্রাম্পের ভূমিকা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নীতির পরিপন্থি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বের পথ সুগম হইবার অন্যতম কারণ ছিল বিশ্বের সকল প্রান্তের দক্ষ ও মুক্তমানুষের অভিবাসন ঘটানো। অভিবাসীদের প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরূপ মনোভাব বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে একটি নেতিবাচক ভাবমূর্তি গড়িয়া তোলে। মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণে মরিয়া ছিলেন তিনি। সাতটি মুসলিম দেশ হইতে পুরোপুরিভাবে বন্ধ করিয়াছিলেন অভিবাসী গ্রহণ। ট্রাম্পের পাগলামির সামনে বড় বাধা ছিল আমেরিকার গণতান্ত্রিক সংবিধান এবং এতদিনকার মূল্যবোধ। মার্কিন প্রেসিডেন্টের যতই এক্সিকিউটিভ পাওয়ার থাকুক, সমানভাবে শক্তিশালী সিনেট, কংগ্রেস ও বিচার বিভাগ। এই কারণে ট্রাম্পের যথেচ্ছাচারকে কিছুটা লাগাম পরানো সম্ভব হইয়াছে। কিন্তু এত কিছুর পরও গত ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের পর আমেরিকার মানচিত্রের বৃহত্ একটি অংশ লাল রঙে রঞ্জিত ছিল। ইহার মাধ্যমে আমরা এই বার্তাও পাই যে, কোভিড মোকাবিলায় এবং অর্থনীতির কিছু ক্ষত নিরাময়ে ট্রাম্প ব্যর্থ না হইলে দ্বিতীয় দফায় তিনি ক্ষমতায় ফিরিতে পারিতেন অনায়াসে। ইহা কী বার্তা দেয়? আমেরিকায় আসলে লাল ও নীলে ভয়ানকভাবে বিভাজিত। বিশ্বের অন্যান্য ডিকটেটরদের মতো ট্রাম্প ক্ষমতা হস্তান্তরেও গড়িমসি করিয়াছেন। যদিও গত সোমবার ক্ষমতা হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করিতে রাজি হইয়াছেন ট্রাম্প। তবে ইহাও বলিয়াছেন যে, তিনি তাহার জয়ের দাবি ছাড়েন নাই এবং তিনি লড়িবেন।

ট্রাম্প যা যা ওলটপালট করিয়াছেন, তাহা সাজানোটা বাইডেনের জন্য হয়তো খুব কঠিন নহে, কিন্তু তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিভাজনকে কী করিয়া সারাইয়া তুলিবেন? আমরা তাহার এই ক্যারিশম্যাটিক কাজটি দেখিবার জন্য অপেক্ষায় থাকিলাম।