ছোটলু ভাই, ভালো থাকবেন

আসাদুজ্জামান নূর

আলী যাকেরকে নিয়ে স্মৃতিকথা লিখতে গেলে মহাকাব্য হয়ে যাবে। কোনদিকটা নিয়ে শুরু করবো সেটাই বড় কঠিন। এমনই ব্যাপ্তি একজন আলী যাকেরের। একজন মুক্তিযোদ্ধা, একাত্তরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কর্মী, আর মঞ্চে তো তিনি আরেক বীর! আমার একটি অনুষ্ঠানে তিনি অতিথি হলে আমরা দু’জনই সম্বোধন নিয়ে খুব মুশকিলে পড়েওযাই। প্রথম চিন্তা—ফর্মাল হবো, না ইনফর্মাল। আলী যাকের বললো, আমার মনে হয় ইনফরমাল হলেই ভালো। এখন তার সঙ্গে আমার প্রায় ৪৫ বছরের সম্পর্ক। কোত্থেকে শুরু করবো ইন্টারভিউটা।  তখন আমি বললাম আমি যেভাবে তোমাকে ডাকি অর্থাত্ ‘ছোটলু ভাই’। আলী যাকের হেসে বললো, দেইখো, অনুষ্ঠানটি প্রচারের পর সারাবিশ্ব আবার এই নামে ডাকতে শুরু না করলেই হয়।

তার জীবনচরিত নিয়ে নানা আলোচনা হবে নিশ্চয়ই। আমি ছোট্ট কিছু বিষয় নিয়ে বলি আজ। যেমন ‘ছোটলু ভাই’ এই নাম নিয়ে একটা মজার গল্প আছে। ১৯৭২ সালে কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, কলকাতা থেকে তিনি এলেন এখানে একুশের অনুষ্ঠানে। সেখানে আলী যাকেরের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আলী যাকের তাকে খুব সমাদর করলেন। নিজে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গেলেন ময়মনসিংহ। এখন কলকাতায় গিয়ে সেই ভদ্রলোক স্মৃতিচারণ লিখেছেন। সেখানে পাবলিশ হওয়ার পর দেখলাম তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশে একজন বিশাল মানুষের সঙ্গে দেখা হলো, যার নাম ‘ছোটলু’। আমরা দু’জনই এ নিয়ে ভীষণ মজা পেলাম। বন্ধু-বান্ধবরাও জানলো। এদিকে আমি আমার টিভি অনুষ্ঠানে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একটা দারুণ বিষয় আবিষ্কার করলাম যে, একটা মানুষকে অনেক চেনা হলেও ঠিক ইন্টারভিউ আকারে বসলে মনে হয় অনেককিছুই জানি না। মানে আমরা ঘর-বাড়িতে গল্প করি মূলত নানা বাইরের অনুসঙ্গ নিয়ে। অথচ দু’জনের সম্পর্কের বয়স তিন যুগেরও বেশি। কতকিছুই জানা হয় না।

স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রে তিনি ইংলিশ সার্ভিসটা দেখতেন আলী যাকের। এটা ছিল ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। আলী যাকের নিজেই বলতেন তখন সারাবিশ্বকে আমাদের দেশের মূল বার্তা পৌঁছানোর দায়িত্বটা আমার কাঁধে। আমার কাজ ছিল ধারাভাষ্য লেখা, পাঠ করা, যুদ্ধক্ষেত্রে একবার যাওয়া সেখান থেকে ইংরেজি রেকর্ড করে সেগুলো প্রচার করা।  সেই স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের সংগ্রাম সেখানেই মামুনুর রশীদের সঙ্গে পরিচয়। অতঃপর একসঙ্গে মঞ্চে কাজ করা। এরপরের এক বর্ণাঢ্য জীবন। যা তিনি নিজের শিল্পপ্রেম থেকে যাপন করেছেন। আজ শুধু এটুকু বলতে পারি। একজন বন্ধু হিসেবে, একজন সহকর্মী হিসেবে আলী যাকেরকে পেয়ে আমি নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে করি। অথচ কী অবাক কাণ্ড শৈশবে আমি ও আলী যাকের কেউই নাটকে অভিনয় করবো বা এই মাধ্যমে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়বো তা কখনো ভাবিনি। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম ভবিষ্যত্ নাট্যকর্মী সম্পর্কে তোমার কী বলার আছে। খুব চমত্কার একটি কথা বলেছিল। আলী যাকের বলেছিল, যেভাবে আমি সর্বান্তকরণে নাটককে, মনপ্রাণে গ্রহণ করেছিলাম এবং যেভাবে আমি প্যাশনেটলি নাটককে ভালোবেসেছিলাম। আমি মনে করি যেকোনো শিল্পকর্মকে যে ভালোবাসতে পারবে, তবেই  উল্লেখযোগ্য কাজ করা তার পক্ষে সম্ভব। কাজেই যারা আসবে, এই মাধ্যমকে ভালোবেসে তাদেরই কিছু একটা করে দেখানোর তাড়না হবে। স্রেফ চেহারা দেখানোর জন্য আমি কিছু করবো। এটা ভাবলে কিছুই হবে না।

ছোটলু ভাই। ভালো থাকবেন।

লেখক:বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব