শিয়াল ও সিংহ

ফরিদুর রহমান

 

সুজন সিকদার এবং শোভন শিকদারের ঘনিষ্ট বন্ধুত্ব অনেকটা কড়াপাকের জোড়া সন্দেশের মতো। দুজনের সম্পর্ক যেমন দীর্ঘদিনের তেমনি জীবন সম্পর্কিত ধারণা ও কাজকর্ম এবং পছন্দ-অপছন্দের মিল অনেকের কাছেই বিস্ময়ের ব্যাপার। ছাত্রজীবন থেকে কবিতা চর্চার ইতিহাস আছে উভয়েরই। বাংলাবাজারের প্রকাশনা সংস্থা নির্বাণ পাবলিশার্স থেকে দুজনের কবিতার বই বেরিয়েছিল একই বছর।

বই দুটোর ছাপার কাজ যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে সে সময় প্রকাশক ভবানন্দ সাহা একদিন বলেছিলেন, ‘আপনাদের দুই জনের নাম লইয়া বড় সমস্যার মধ্যে আছি। কে যে দন্ত্য ‘স’ আর কে যে তালব্য ‘শ’ মাঝে-মধ্যেই প্যাঁচ লাইগা যায়।’ ‘আমার নাম সুজন আর সিকদার দুই জায়গাতেই সিংহের ‘স’ আর শোভনের দুইটাই তালব্য ‘শ’ অর্থাত্ শিয়ালের ‘শ’।’ সুজন সিকদার সমস্যার সহজ সমাধান বাতলে দেয়। কথাটা শুনে শোভন মুচকি হেসেছিল, কোনো মন্তব্য করেনি। 

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে পড়াশোনা শেষ করে চাকরির চেষ্টায় ঘোরাঘুরি শুরু করেছিল দুজন একসঙ্গে। একটি বেসরকারি মহিলা কলেজে বাংলা পড়াবার চাকরিও পেয়েছিল সহজেই। কিন্তু সুজন সিকদার প্রভাষক হিসাবে কলেজে যোগ দিলেও শোভন শিকদারের যোগদানপত্র গ্রহণ করেননি কলেজ কর্তৃপক্ষ। ব্যাপারটা সুজন শোভন দুজনকেই ভাবিয়ে তুলেছিল। অবশ্য কয়েক দিনের মধ্যে সুজন খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, মেয়েদের কলেজে সদ্য পাশ করা একজন অবিবাহিত তরুণকে নিয়োগদানের বিষয়ে ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের কেউ কেউ আপত্তি তোলায় শোভনের চাকরিটা শেষ পর্যন্ত হয়নি।

জীবনের নানা ক্ষেত্রে দুজনের মিল থাকলেও এই একটি ক্ষেত্রে শোভন পিছিয়ে পড়েছে বলা যায়। মাস ছয়েক বইপত্র দেয়া-নেয়া, একসঙ্গে চলাফেরা এবং চায়ের দোকানে আড্ডা শেষে অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার পরপরই এক বছরের জুনিয়ার সামিনাকে বিয়ে করে ফেলেছে সুজন। অন্যদিকে রাতের পর রাত জেগে দিস্তা দিস্তা কবিতা লিখে, এমনকি কবি হিসাবে যথেষ্ট খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ার পরেও নারী চরিত্রের রহস্য ভেদ করা শোভনের পক্ষে সম্ভব হয়নি। কোনো মেয়ের আস্থা অর্জনে শোভন পুরোপুরি ব্যর্থ হলেও এই অমিল দুজনের সম্পর্কের ভেতরে কোনো প্রভাব ফেলেনি।

চাকরি পাবার পরে সুজন স্ত্রীসহ ছোট্ট একটি ফ্লাটবাড়িতে উঠে গেছে। সেখানে শোভনের অবাধ যাতায়াত। বেচারা ব্যাচেলার মানুষ কোথায় কী খায় না খায় সেদিকে সুজন সামিনা দুজনেরই সমান নজর। একবার আকস্মিক জ্বরে পড়ে শোভন কয়েক দিন আসতে না পারায় সামিনা নিজে তার জন্যে কই মাছের ঝোল রান্না করে নিয়ে গেছে। বাবার অসুস্থতার খবর পেয়ে সুজনকে একবার হঠাত্ বাড়ি যেতে হয়েছিল। তখন সামিনা ভাবির খোঁজখবর নেয়া এবং বাজারঘাটসহ সব ভালোমন্দ দেখাশোনার দায়িত্ব স্বাভাবিকভাবেই এসে পড়েছিল শোভনের কাঁধে।

বছর তিনেক পরে একদিন গ্রামের বাড়ি যাবার সময় প্রকাশক ভবানন্দ সাহার সঙ্গে লঞ্চের ডেকে সুজন সিকদারের দেখা হয়ে যায়। কুশল বিনিময়ের পরে ভবানন্দ বলেন, ‘লেখালিখি ছাইড়া দিলেন নাকি? আজকাল আর বাংলাবাজারের দিকে আসেন না!’

‘কবিতা লিখে কী হয়! বাজারে বই আর ঘরে বউ কোনোটাই তো চলে না।’                               

‘আপনার সেই বন্ধু—শিয়াল শিকদারের খবর কী?’ অবাক ভাবানন্দ প্রশ্ন করেন।                                                         

কিছুক্ষণ নীরব থাকার পরে উত্তর দেয় সুমন সিকদার, ‘শিয়াল—মুরগি নিয়ে ভেগে গেছে।’