আমেরিকার ২৩১ বছরের নির্বাচনের ইতিহাসে ২০২০ সালের নির্বাচনটি বিশেষ স্থান দখল করেছে। এই নির্বাচনটি যেসব বিতর্ককে উসকে দিয়েছে এবং আরো গুরুত্বের সঙ্গে বলতে গেলে, এসব বিতর্ককে যেভাবে সমাধান করা যেত, সেটি শুধু আমেরিকার ভবিষ্যত্ প্রেসিডেন্সিকেই নয়, রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতিকেই সম্ভবত পালটে দিতে পারে। অন্যভাবে বলা যায়, যে প্রশ্নটি পর্যবেক্ষকদের মনে প্রচ্ছন্নভাবে উঁকি দিচ্ছে, আমেরিকার এই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কি টিকে থাকবে? যদি তা না-ই থাকে, তাহলে সেটি কোন রূপ ধারণ করবে?
১৭৮৯ সালের নির্বাচন জর্জ ওয়াশিংটকে আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে অধিষ্ঠিত করেছিল। আমেরিকার সংবিধানের উদ্দীপ্ত প্রেরণা ছিল সরকারের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ—আইন, বিচার এবং নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা যার মধ্যে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা পরিকল্পিতভাবে অপেক্ষাকৃত কম রাখা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, যে কোনো সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতার উত্থান রোধ করা। যা-ই হোক, পরবর্তী দুই শতকে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিবর্তনের সুবাদে বিষয়টি পরিবর্তিত হয়। ফলাফলস্বরূপ, ১৯৪৫ পরবর্তী স্নায়ুযুদ্ধকালীন নির্বাহী বিভাগ, বিশেষত প্রেসিডেন্টের মর্যাদা, কর্মপরিধি এবং ক্ষমতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায় যেটি আমেরিকার সংবিধান প্রণেতারা ১৭৮৭ সালে সংবিধান প্রণয়নকালে পরিকল্পনা করেননি। নিরবচ্ছিন্নভাবে আইনকে উপেক্ষা করার ফলে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রেসিডেন্টের দিকে হেলে পড়ে যেটি আইনসভা এবং ইউএস সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতাকে ম্লান করে দিয়েছে। বস্তুত আমেরিকার সংবিধানে আইন, বিচার এবং নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার ভারসাম্য অর্জনই ছিল মূল লক্ষ্য। পরবর্তী দশকগুলোতে প্রেসিডেন্টের এই ক্ষমতা শুধু বৃদ্ধিই পেয়েছে, যা ৯/১১ বাস্তবতায় অনন্য উচ্চতায় পৌঁছায়। ঐতিহাসিক আর্থার এম সেলেজিংগার জুনিয়র তার দ্য ইমপেরিয়াল প্রেসিডেন্সি বইতে আশঙ্কা করেছিলেন, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা এতটাই অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে, যা সংবিধানের সীমাবদ্ধতাকেও অতিক্রম করে গিয়েছে। তার এই বক্তব্য আজকের দিনেও সত্য, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ধারণার বাস্তব প্রতিফলন।
সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী আমেরিকার ৫৯তম প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ৩ নভেম্বর ২০২০ তারিখে কিন্তু পরবর্তীতে এই নির্বাচন বিতর্কিত হয়ে ওঠে, যখন বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের বিজয়কে প্রত্যাখ্যান করেন। এমনকি এর অনেক আগে থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলে এসেছেন, নির্বাচন তখনই সুষ্ঠু হবে, যখন তিনি বিজয়ী হবেন। অন্যথায় এই নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে বলে ধরে নিতে হবে, যা তাকে নির্বাচনি ফলাফলের বিরুদ্ধে লড়াই করতে বাধ্য করবে। এর সঙ্গে তিনি শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরেও অস্বীকৃতি জানান। এই বিষয়টির সঙ্গে আমেরিকার ইলেকটোরালের ভবিষ্যত্ও সংকটের সম্মুখীন। সিনেটের মাইক লি এক বার্তায় বলেছেন, ‘আমরা গণতান্ত্রিক নই...গণতন্ত্র লক্ষ্য নয়, আমাদের লক্ষ্য শান্তি, সাম্য এবং উন্নয়ন। আমরা চাই মানুষের অবস্থার উন্নতি হোক। কাঠামোগত গণতন্ত্র সেটাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।’ আপাতদৃষ্টিতে তার বক্তব্য আমেরিকার রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিপক্ষে গেলেও এর একটি তাত্পর্য রয়েছে—আমেরিকার সংবিধানের কোথাও গণতন্ত্র শব্দটিই উল্লেখ করা হয়নি। সংবিধানে বলা হয়েছে আমেরিকা হবে একটি প্রজাতান্ত্রিক দেশ, গণতান্ত্রিক নয়। এই জটিল ইলেকটোরাল অচলাবস্থা সরকার পরিচালনায় ঐকমত্যকে সামনে নিয়ে এসেছে, যেটি আজকের দিনে সুস্পষ্টভাবে অনুপস্থিত। সমস্যা হচ্ছে—এই অবস্থাটি ইলেকটোরাল থেকে রাজনৈতিক, আইনি এবং সম্ভবত অদূর ভবিষ্যতে বিচারিক ব্যবস্থার সম্মুখীন হবে। নির্বাচনটি শক্তি প্রদর্শনের রাজনীতিতে নেমে আসার পর যতটা না ভোটারদের জয় করা, তার চেয়েও ক্ষমতা দখলের লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে; যেটি গণতন্ত্রের ধারণাকেই অবমূল্যায়ন করছে। উল্লেখ্য আমেরিকার ইতিহাসে এই বিতর্ক প্রথম নয়, গৃহযুদ্ধ (১৮৬১-৬৫) পরবর্তী ১৮৭৬, ১৯৩২ (মহামন্দা সময়কালীন) এবং অতি সম্প্র্রতি ২০০০ সালের নির্বাচন নিয়েও একই বিতর্ক হয়েছিল।
গত ২৩ নভেম্বর ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে জেনারেল সার্ভিসেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনকে (জিসিএ) নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ট্রানজিশন প্রক্রিয়া শুরু করার অনুমতি প্রদান করেন। তবে ট্রাম্প এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পরাজয় স্বীকার করেননি, তার এই অস্বীকৃতি গভীরভাবে আইনি এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। প্রেসিডেনশিয়াল ট্রানজিশন অ্যাক্ট, ১৯৬৩-তে উল্লেখ রয়েছে, জিসিএ ট্রানজিশন প্রক্রিয়া সহজতর করতে কাজ করবে এবং এই আইনে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে একজন দৃশ্যমান সফল প্রার্থী হিসেবে ট্রানজিশন প্রক্রিয়ায় সব ধরনের অধিকারসমূহ প্রদান করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বাইডেন স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন, ট্রাম্পের তার কাছে পরাজয় স্বীকারে একগুঁয়েমি এবং ট্রানজিশন প্রক্রিয়ায় বিলম্ব করা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা এবং সেই সঙ্গে চলমান স্বাস্থ্য সংকটকে আরো ক্ষতিগ্রস্ত করবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব দ্য স্টেট মাইক পম্পেই সম্প্র্রতি বলেছেন, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রানজিশন প্রক্রিয়া বেশ সহজতরই হবে!
২০১৭ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকে ট্রাম্প ধারাবাহিকভাবে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন, রাষ্ট্রীয়-বহুপাক্ষিক-আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন। সেই সঙ্গে কংগ্রেসের কর্তৃত্ব হ্রাসকে ত্বরান্বিত করেছেন যেই প্রক্রিয়া আগে থেকেই চলমান ছিল। যদিও ১৯৭০ সালে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা হ্রাস এবং সংশোধনে কংগ্রেস প্রচেষ্টা চালিয়েছিল কিন্তু সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। তারা একটি বিষয়কে উপেক্ষা করে গিয়েছিল, আদর্শ ততটাই গুরুত্বপূর্ণ যতটা গুরুত্বপূর্ণ নিয়মাবলি ও কার্যপ্রণালি। একজন প্রেসিডেন্ট যিনি নিয়মনীতির তোয়াক্কা করেন না, তাকে শুধু নিয়মনীতি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
ট্রাম্প হয় রাজনৈতিক স্খলনের প্রতিচ্ছবি, না হয় আমেরিকার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি আছে কি না সেটি ভেবে দেখার সময় এসেছে। আমেরিকার গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নাগরিক অধিকার। ম্যাথু কার্সন ও বেঞ্জামিন জিন্সবার্গের মতে, সরকারের ক্ষমতা সম্প্র্রসারণের সঙ্গে সরকারি থেকে বেসরকারিকরণ সংঘটিত হচ্ছে। বলা যায় যে, নাগরিকদের অধিকার খর্ব করে এবং তাদেরকে রাজনৈতিক অংশগ্রহণকারী হিসেবে বিবেচনা না করে ভোক্তা এবং রাজনৈতিক অভিনেতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিষয়টির সঙ্গে গণতন্ত্রের ধারণা সাংঘর্ষিক। এই বিশ্লেষণটি গণতান্ত্রিক আদর্শের কার্যকারিতাকে এমন একটি পরিস্থিতির সম্মুখীন করছে, যেখানে তাদের নব্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সামঞ্জস্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
লোয়েলা ইউনিভার্সিটি শিকাগো ল জার্নালের আগস্ট ২০১৯ সংস্করণে ‘বিতর্কিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রস্তুতি : নির্বাচনের ঝুঁকি ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত আলোচনা’ আর্টিকেলে প্রফেসর অ্যাডওয়ার্ড বি ফলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা হস্তান্তরের তারিখ ২০ জানুয়ারি, ২০২১ পর্যন্ত নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিতর্ক অমীমাংসিত থাকতে পারে এবং তা মিলিটারির ক্ষমতা গ্রহণকেই ইঙ্গিত করে। আপাতদৃষ্টিতে নিবিড় পর্যবেক্ষণে এর অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক তাত্পর্য রয়েছে।
আমেরিকার জনগণের ভবিষ্যতে কী রয়েছে তা এই মুহূর্তে পরিষ্কার নয়। নির্বাচনি নাটকের শেষ দৃশ্যে কী ঘটবে তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে ২০ জানুয়ারি ২০২১ পর্যন্ত। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিবিশেষের ওপর আলোকপাত করা কিংবা তাকে দোষারোপ করা বর্তমান সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে উপযুক্ত নয় এবং তা সন্তোষজনক কোনো সমাধানও দিতে পারবে না। বরং আরো গভীরতর সমস্যা প্রতীয়মান হয়ে উঠছে।
n লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়