এ টি এম আনোয়ারুল কাদির
একসময় মনের ভাব আদান-প্রদানের একমাত্র মাধ্যম ছিল চিঠি। একটা চিঠিতে থাকত সুখ-দুঃখ, আবেগ, অনুভূতি ও ভালোবাসা। চিঠি নিয়ে হয়েছে অনেক সাহিত্য—গান, কবিতা, নাটক ও চলচ্চিত্র। একটা চিঠির জন্য বাবা-মা, সন্তান, প্রেমিক-প্রেমিকা অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকত। আমরা এখন এসএমএস ও ইমেইল ব্যবহারে ঝুঁকে পড়েছি। অথচ চিঠি এবং মেসেজ/ইমেইল কখনো এক হতে পারে না। মেসেজ/ইমেইল স্থায়ী নয়। চিঠি স্থায়ী—এজন্য ডাক বিভাগ একটি স্লোগান ব্যবহার করে ‘চিঠি লিখুন ইহা স্থায়ী’।
এখন চিঠির প্রচলন অফিস-আদালতেই শুধু দেখা যায়। তবে বেশিরভাগ চিঠিই কুরিয়ারযোগে প্রেরিত হয়ে থাকে। অথচ একসময় ডাক বিভাগই ছিল আস্থা ও নির্ভরতার জায়গা। ডাকঘর থেকে চিঠি পাওয়া নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। ঢাকার মধ্যেই একটা চিঠি পৌঁছাতে এক সপ্তাহ, অন্য জেলা/উপজেলা থেকে ঢাকা আসতে এক মাস এবং বিদেশে যেতে প্রায় ছয় মাস সময়ও লেগে যায়! ডাক বিভাগ জিইপি, ইএমএস সেবা খুলেও আস্থা অর্জন করতে পারছে না। জেলা/উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন ডাকঘর নিয়মিত মনিটরিং ও পরিদর্শন করা হলে এ ধরনের অভিযোগ থাকত না। ডাক বিভাগের কর্মচারীদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। শোনা যায়, একজন প্রাপকের নামে কয়েকটি চিঠি জমা হলে একসঙ্গে বিলি করা হয়! এসব চিঠির খামে ডাকঘরের নামসহ তারিখ সম্বলিত সিলমোহর ব্যবহারেও তাদের অনীহা। এমনভাবে সিলমোহর ব্যবহার করা হয় যে, কারো পক্ষে তার পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয় না। অফিসের চিঠিপত্রে প্রেরণ ও বিলিকারী পোস্ট অফিসের নাম ও তারিখের প্রয়োজন হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিভিন্ন ডাকঘরের পোস্টমাস্টার ও কর্মচারীরা ডাক বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত স্মারক ডাকটিকিট সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। কোনো প্রেরক খামে স্মারক ডাকটিকিট লাগিয়ে চিঠি পোস্ট করতে গেলে তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানানো হয় এবং প্রশ্ন করা হয়—এ ডাকটিকিট কি আপনি নিজে করেছেন? এজন্য তাদের দোষারোপ করাও ঠিক না। কারণ তাদের ফিলাটেলি বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণ নেই এবং নেই মনিটরিং ও পরিদর্শন। প্রসঙ্গত, এখন যেসব স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয় তা শুধু ঢাকা জিপিও-র ফিলাটেলিক ব্যুরো থেকে বিক্রি করা হয়। একসময় সমস্ত প্রধান ডাকঘর ও বিভাগীয় শহরের জিপিও থেকে প্রকাশের দিন একসঙ্গে পাওয়া যেত। এখন শুধু ঢাকা থেকে বিক্রি হওয়ায় ডাকটিকিট সংগ্রাহকের সংখ্যা কমে আসছে। ঢাকা জিপিও থেকেও সাধারণ ডাকটিকিট সংগ্রাহকরা প্রয়োজনীয় সংখ্যক ডাকটিকিট ক্রয়ের সুযোগ পাচ্ছেন না। নব্য ডাকটিকিট ব্যবসায়ীরা অধিকাংশ ডাকটিকিট নিয়ে যান। কাজেই একটি বিক্রয় নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। একজন সংগ্রাহককে অন্তত দুই সেট ডাকটিকিট ও উদ্বোধনী খাম ক্রয়ের সুযোগ দেওয়া উচিত। সংগ্রাহকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় সরকারের রাজস্ব আয়ের সুযোগ কমে যাচ্ছে। বিশ্বের অনেক দেশেই রাজস্ব আয়ের অন্যতম মাধ্যম হলো ডাকটিকিট। অথচ আমাদের ডাক বিভাগের নিয়মিত মনিটরিং ও পরিদর্শন না হওয়ায় সাধারণ মানুষের চিঠি প্রেরণের ব্যবহার প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে।
আমার বিশ্বাস—ডাক বিভাগ যদি তার সেবা নিশ্চিত করে অর্থাত্ যথাসময়ে চিঠি বিলি, স্মারক ডাকটিকিট ঢাকাসহ বিভিন্ন প্রধান ডাকঘর ও বিভাগীয় শহরের জিপিও থেকে বিক্রি, সংগ্রাহকদের মধ্যে বিক্রির সুযোগ, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ডাকসেবা ও ফিলাটেলির ওপর নিয়মিত প্রশিক্ষণ সর্বোপরি নিয়মিত মনিটরিং ও পরিদর্শনের ব্যবস্থা হলে ডাক বিভাগের সুদিন ফিরে আসবে এবং সরকারের রাজস্ব আয় বহুগুণে বাড়বে।
সাধারণ সম্পাদক, ফিলাটেলিস্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (পিএবি), ঢাকা