ইরানের শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী আততায়ীর হাতে নিহত

ইরানের সবচেয়ে প্রবীণ পরমাণু বিজ্ঞানী ও পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক মোহসিন ফখরিজাদে রাজধানী তেহরানের কাছে আততায়ীর আক্রমণে মারা গেছেন। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্র খবরটি নিশ্চিত করেছে। গতকাল শুক্রবার দামাভান্দ এলাকায় হামলার পর ‘বোমার জনক’ খ্যাত ফখরিজাদে হাসপাতালে মারা যান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় দাবি করছে, এর পেছনে ইসরাইলের হাত আছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর অফিস এই বিষয়ে সিএনএনের কাছে কোনো মন্তব্য করেনি। খবর সিএনএন ও বিবিসির

বিভিন্ন ছবিতে দেখা গেছে, ঘটনাস্থলে একটি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, যার জানালার কাচ ভেঙে গেছে এবং রাস্তায় ছোপ ছোপ রক্ত। ইরানের বার্তা সংস্থাগুলো বলছে, আততায়ীরা প্রথমে তার গাড়ি লক্ষ্য করে বোমা ছোড়ে এবং তারপর তাকে গুলি করে। ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় গতকাল এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, রেভল্যুশনারি গার্ডসের গবেষণা ও উদ্ভাবনী সংস্থার প্রধান মোহসিন ফখরিজাদেকে নিয়ে যে গাড়িটি যাচ্ছিল, সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা সেই গাড়ি লক্ষ্য করে বোমা হামলা চালায়। তার দেহরক্ষী ও সন্ত্রাসীদের মধ্যে এরপর সংঘর্ষ হয়। এতে ফখরিজাদে গুরুতরভাবে আহত হন এবং দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিত্সাকর্মীরা তাকে বাঁচানোর সব রকম চেষ্টা করলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে তারা ব্যর্থ হন এবং তিনি মারা যান।

প্রতিক্রিয়া

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ এই ঘটনাকে ‘কাপুরুষোচিত ও সন্ত্রাসী কাজ’ বলে বর্ণনা করেছেন। এক টুইট বার্তায় ইসরাইলের জড়িত থাকার দিকে তিনি ইঙ্গিত করেছেন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা যেন এই ঘটনাকে ‘সন্ত্রাসী কাজ’ বলে নিন্দা করে এবং দ্বিচারিতা না করে এই ঘটনার তদন্ত করে। ইরানের রেভ্যুলিউশনারি গার্ডের কমান্ডার বলেছেন, এই হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ নেওয়া হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিজ্ঞানী নিহত হওয়ার বিষয়ে ইসরাইলি সাংবাদিক ইয়োসি মেলমানের টুইট রিটুইট করেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন বলছে, তারা এই হত্যাকাণ্ডের ওপর গভীর নজর রাখছে। এটা একটা বড় ঘটনাই হবে।

কে ছিলেন মোহসিন ফখরিজাদে?

মোহসিন ফখরিজাদে ইরানের সবচেয়ে বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গবেষণা ও উদ্ভাবনী সংস্থার প্রধান।  তিনি ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও ছিলেন। কূটনীতিকরা তাকে ইরানে ‘বোমার জনক’ বলে বর্ণনা করতেন। ইসরাইল এবং পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে তিনি ইরানের খুবই ক্ষমতাশালী ব্যক্তি এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচির মাস্টারমাইন্ড। ২০১৮ সালে ইসরাইল বলেছিল, তাদের হাতে যেসব গোপন নথিপত্র এসেছে সেগুলো অনুযায়ী ইরানের পরমাণু কর্মসূচির তিনি প্রধান রূপকার। ফখরিজাদের নেতৃত্বেই ইরানের পরমাণু কর্মসূচি গড়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সে সময় বলেছিলেন ‘ঐ নামটা মনে রাখবেন’। তিনি বলেছিলেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচির তিনিই প্রধান বিজ্ঞানী। ২০১৫ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমস তার তুলনা করেছিল জে রবার্ট ওপেনহাইমারের সঙ্গে। ওপেনহাইমার দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় ম্যানহাটান প্রকল্পের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যে প্রকল্পের অধীনে প্রথম আণবিক বোমা তৈরি করা হয়।

২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ইরানের চার জন পরমাণু বিজ্ঞানী আততায়ীর হাতে প্রাণ হারিয়েছেন এবং এইসব হত্যার ঘটনায় ইসরাইল জড়িত বলে ইরান অভিযোগ করেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইরাকের বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মার্কিন হামলায় ইরানের জেনারেল কাসেম সোলেইমানি নিহত হন।

ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উত্পাদনের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে বলে নতুন করে উদ্বেগ বেড়েছে। এরই মধ্যে এই হত্যার ঘটনা ঘটল। বেসামরিক খাতে পারমাণবিক জ্বালানি তৈরির জন্য এবং একই সঙ্গে সামরিক কাজে ব্যবহারযোগ্য পারমাণবিক অস্ত্র উত্পাদনের জন্য সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম একটি আবশ্যিক উপাদান। ইরান সবসময়েই বলে এসেছে তারা শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের জন্যই একমাত্র তাদের পরমাণু কর্মসূচি ব্যবহার করে।