পার্বত্যাঞ্চলে পর্যটন বিকাশে প্রধান অন্তরায় দুই সংগঠন

পার্বত্যাঞ্চলে পর্যটনশিল্প বিকাশে প্রধান অন্তরায় দুই সংগঠন জেএসএস মূল ও ইউপিডিএফ। সেখানে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ প্রতিষ্ঠা হলে তাদের কর্তৃত্বের অবসান ঘটবে বলে তারা অপার সম্ভাবনাময় পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটতে দিতে চায় না। এই দুই সংগঠন বছরে ৪০০ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে পার্বত্যাঞ্চলে। আর এই টাকার ভাগ পান কতিপয় বুদ্ধিজীবী ও একশ্রেণির রাজনীতিবিদ। এ কারণে জেএসএস মূল ও ইউপিডিএফর পক্ষে বিভিন্ন সময় তারা কথা বলেন, বিবৃতি দেন। এই অবস্থার অবসান ঘটানোর দাবি জানিয়ে পাহাড়ি বাঙালিরা বলেন, আমরা শান্তি চাই, এক সঙ্গে বাঁচতে চাই।  বিশ্বব্যাপী পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ১০০ কোটি। তাদের ৭৫ শতাংশ এখন ভ্রমণ করেন  এশিয়ার দেশগুলোতে। সারা বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল কয়েকটি পর্যটন কেন্দ্রের মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। এর বাইরে প্রতি বছর ৯০ থেকে ৯৫ লাখ দেশি পর্যটক দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে ভ্রমণ করেন। বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন এলাকা পার্বত্যাঞ্চল। পার্বত্য চট্টগ্রাম মূলত তিনটি জেলা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি নিয়ে গঠিত। পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটনের মূল আকর্ষণ পাহাড়ঘেরা সবুজ প্রকৃতি, যা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে পর্যটকদের কাছে ধরা দেয় ভিন্ন ভিন্ন রূপে। এটি যেন ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলানোর খেলা। ভ্রমণপিপাসুদের কাছে শীতে পাহাড় যেমন এক রূপে হাজির হয়, তেমনি বর্ষায়ও ভিন্ন এক রূপের দেখা মেলে পাহাড়ে। শীতে পাহাড় কুয়াশা ও মেঘের চাদরে ঢাকা থাকে, তার সঙ্গে থাকে সোনালি রোদের মিষ্টি আভা। আবার বর্ষায় চারদিকে ছড়িয়ে থাকে সবুজের সমারোহ। সে সময় প্রকৃতি ফিরে পায় নতুন যৌবন। বর্ষায় মূলত রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত থাকে পার্বত্যাঞ্চল। তখন এখানে ঝরনা, হ্রদ কিংবা নদীপথগুলো নতুন রূপে সেজে ওঠে যা দেখার জন্য অসংখ্য পর্যটক এখানে ভিড় করেন। এর সঙ্গে আছে পাহাড়ের মানুষের ভিন্নধর্মী জীবনাচরণ। পর্যটনের জন্য পার্বত্যাঞ্চল একটি অপরূপ সুন্দর জায়গা। এমন পরিবেশ বিশ্বের কোথাও নেই। পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলে এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটিয়ে পর্যটন এলাকা ঘোষণা করা হলে এ খাত থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের হাতছানি রয়েছে বাংলাদেশের সামনে। সেটি হলে অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী এক দেশ হবে বাংলাদেশ।

করোনার মধ্যেও হাজারো পর্যটক পাহাড়ে বেড়াতে গেছেন। রাঙ্গামাটির বরকল উপজেলায় শিলার ডাক রিসোর্টে একজন পর্যটকের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। ঢাকার যাত্রাবাড়ীর ব্যবসায়ী সুরুজ মিয়া স্ত্রী-সন্তানসহ বেড়াতে এসেছেন। তিনি বলেন, অনেক দেশে ভ্রমণ করেছি। কিন্তু পার্বত্যাঞ্চলের মতো এমন পরিবেশ কোথাও পাইনি। রাঙ্গামাটিতে ছয়-সাত দিন থেকে তারা যাবেন বান্দরবান। এরপর খাগড়াছড়িও যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

ঢাকায় বসবাসরত চাকরিজীবী রুহুল আমিনও সপরিবারে এসেছেন। তিনি বলেন, অফিসের কাজে বিভিন্ন সময় বিদেশে গেছি। কিন্তু পার্বত্যাঞ্চলে আসলে মনটা ভরে যায়। পুরো পার্বত্যাঞ্চল নিরাপত্তা বেষ্টনী দিয়ে পর্যটন কেন্দ্র করে দেওয়া হলে দেশ আর্থিকভাবে শক্তিশালী হবে।

শুভলংয়ে দেখা হয় ঢাকার ধানমন্ডিতে বসবাসরত ব্যবসায়ী ফয়সালের সঙ্গে। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বেড়াতে এসেছেন তিনি। বসুন্ধরা এলাকার বাসিন্দা আশরাফ আলী এসেছেন স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের ১০ জনকে নিয়ে। হাউজিং ব্যবসায়ী নুরুল আমিন উত্তরা থেকে। নুরুল আমিন বলেন, পার্বত্যাঞ্চলকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে সার্বিকভাবে প্রস্তুত করার কাজটি একমাত্র প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়া আর কেউ পারবেন না। এখানে নিরাপত্তার অভাব না থাকলে মানুষের ভিড় লেগেই থাকত। নিরাপত্তার অভাব অনুভব করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, পর্যটনশিল্প বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জেএসএস মূল ও ইউপিডিএফ নামক দুটি সংগঠন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, পর্যটকদের আকর্ষণ নিরুত্সাহিত করতে তারা বিভিন্ন সময় রাস্তায় পর্যটকদের ওপর হামলা ও নির্যাতন করেন।

এদিকে পর্যটনশিল্প বিকাশের অংশ হিসেবে বান্দরবানে পাঁচ তারকা হোটেল করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকারের এমন উদ্যোগেরও বিরোধিতা করছে জেএসএস মূল ও ইউপিডিএফ। আর তাদের সুরে কথা বলছেন কতিপয় বুদ্ধিজীবী ও একশ্রেণীর রাজনীতিবিদ। পাহাড়ি বাঙালিদের সঙ্গেও কথা বলে জানা গেছে, পার্বত্যাঞ্চলে শান্তি বিনষ্টের মূলে জেএসএস মূল ও ইউপিডিএফ। একজন পাহাড়ি বাঙালি নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আপনি যদি আমার নাম প্রকাশ করেন তাহলে পুরো পরিবারকে মেরে ফেলবে তারা। পাহাড়ি বাঙালিরা বলেন, পার্বত্যাঞ্চলে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত ও শান্তি বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অক্লান্ত পরিশ্রম করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী না থাকলে আমরা টিকে থাকতে পারতাম না।