নেপথ্য কাহিনি ধারাপাত

 

‘রূপবান’ (১৯৬৫)-এর পরিচালক সালাহ্উদ্দিন প্রথম জীবনে ছিলেন কলেজের শিক্ষক। এফডিসি থেকে ঢাকায় চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে নাম লেখান পরিচালনায়। প্রথম ছবি ‘যে নদী মরু পথে’ মুক্তি পায় ১৯৬১ সালে। তারপর আলাউদ্দিন আল আজাদের গল্প থেকে বানান ‘সূর্যস্নান’ (১৯৬২)। সেই ষাটের দশকেই ছবিটি চীন, লেবানন ও ইরানসহ বেশ কয়েকটি দেশের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে প্রদর্শিত হয়। পায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিকসহ বেশ কিছু পুরস্কার।

তবু পরের ছবি বানাতে গিয়ে গলদঘর্ম হতে হয় তাঁকে। এর মধ্যে ঢাকায় পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন তিনি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লার বাড়ি বিক্রির টাকায় প্রতিষ্ঠা করেন নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থা—‘সালাহ্উদ্দিন প্রোডাকশন্স’। সেই ব্যানারেই শুরু করেন নিজের তৃতীয় ছবির কাজ।

সে সময় আমজাদ হোসেন মাত্র জামালপুর থেকে ঢাকায় এসেছেন। যুক্ত হয়েছেন নাটকের দলে। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখি করেন— ভাবলেন নিজেই লিখবেন নাটক। লিখলেনও। ‘ধারাপাত’। এক ক্ষয়িষ্ণু মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্প। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে সেটা মঞ্চস্থ করলেন ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউটে। রীতিমতো হৈচৈ পড়ে গেল। নিজের তৃতীয় ছবির জন্য নাটকটি পছন্দ করলেন সালাহ্উদ্দিন। এমনকি নামও একই রাখলেন—‘ধারাপাত’।

এমনিতেই কম বাজেটের ছবি। তার ওপর পরিবেশকদের কাছ থেকে আগাম কোনো সাড়াই মিলল না। তখন এফডিসি থেকে কারিগরি সহায়তা পাওয়া যেত বটে, তবে সেজন্য সিকিউরিটি বাবদ এককালীন কিছু টাকা জমা রাখতে হতো। সেটা দিতে না পারায় সালাহ্উদ্দিন সেই সুবিধাটাও নিতে পারলেন না।

তখনো দেশে শ্যুটিংয়ে ডাবিংয়ের প্রচলন হয়নি। ইনডোর-আউটডোর সর্বত্র টকি শ্যুটিং করা হতো। মানে অডিও আর ভিডিও একসঙ্গে ধারণ করা। প্রয়োজনের তাগিদেই নতুন পথে হাঁটলেন সালাহ্উদ্দিন। ঠিক করলেন, ‘ধারাপাত’-এ টকি শ্যুটিং করবেন না। লোকেশনে শুধুই ভিডিও ধারণ করবেন। পরে সে অনুযায়ী স্টুডিওতে ডাবিং করে নেবেন। তাতে দুটো ঘাটতিই পুষিয়ে যাবে—এফডিসি থেকে কারিগরি সহায়তা না পাওয়া আর মূলধন বা টাকার ঘাটতি।

এমনিতেই ঢাকার চলচ্চিত্র তখন সবেমাত্র যাত্রা শুরু করেছে। টেকনিশিয়ানরা সবাই নতুন নতুন কাজ করছেন। এরই মধ্যে এমন পরীক্ষামূলক শ্যুটিং করলেন সালাহ্উদ্দিন! শুধু যে আলাদা ডাবিংয়ের আয়োজন করলেন তাই নয়; খরচ কমাতে ঝুঁকি নিলেন আরো। পরিকল্পনা করলেন রাশপ্রিন্ট বের না করে সরাসরি আর/আর প্রিন্ট করার! সে দায়িত্ব নেন বশীর হোসেন। তিনি এ ছবির সহকারী পরিচালক। রাশপ্রিন্ট ছাড়া সম্পাদনা করতে হবে বলে ঠিক করলেন, হাজির থাকবেন ছবির সমস্ত শ্যুটিংয়ে— যাতে মাথায় ঢুকিয়ে নেওয়া যায় প্রত্যেকটা শটের খুুঁটিনাটি।

ঢাকায় তখন আতাউল্লাহ শাহ হাশমী নামে লাহোরের এক চলচ্চিত্র ব্যবসায়ী ক্যামেরা ভাড়া দিতেন। এফডিসি থেকে সরঞ্জাম না পেয়ে হাশমী সাহেবের ক্যামেরায় পুরো ছবির শ্যুটিং সারেন সালাহ্উদ্দিন। সাইলেন্ট শ্যুটিং। পুরোটা সময় সংলাপ ও শটের ধারাবাহিকতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লিখে রাখা হয়। পরে সে অনুযায়ী ভয়েস রেকর্ড করা হয় পাত্র-পাত্রীদের। তখন ঢাকায় গ্রামোফোন রেকর্ড কোম্পানি এইচএমভি-র (হিজ মাস্টার্স ভয়েস) একটা ছোট স্টুডিও ছিল, সেখানেই সম্পন্ন হয় রেকর্ডিং।

তারপর অডিও টেপ ও ভিডিও ফিল্ম নিয়ে সালাহ্উদ্দিন চলে যান লাহোর। সেখানকার এভারনিউ স্টুডিওতে ভিডিও ফিল্ম থেকে ডেভেলপ করা হয় পিকচার নেগেটিভ। অডিও টেপের সাউন্ড অপ্টিক্যাল ট্রান্সফার করা হয়। সবশেষে পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী রাশপ্রিন্ট বের না করে খালি চোখের ওপর ভরসা করেই পিকচার নেগেটিভের সঙ্গে সাউন্ড সিঙ্ক করে সরাসরি করা হয় আর/আর প্রিন্ট। এটা যে কত বড় ঝুঁকির কাজ ছিল, সেটা কেবল তাঁরাই বুঝবেন যাঁরা চলচ্চিত্র নির্মাণের পুরনো কলাকৌশল সম্পর্কে ধারণা রাখেন।

এত কিছু করেও ছবি মুক্তি দিতে ভালোই বেগ পেতে হয় সালাহ্উদ্দিনকে। বিয়োগান্তক পরিণতির ছবি বলে আপত্তি তোলেন পরিবেশকরা। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর মুক্তি পায় ‘ধারাপাত’। সুন্দর কাহিনির ছবিটি সবার প্রশংসা কুড়োলেও বিনিয়োগ তুলতে ব্যর্থ হয়। আর সেই শিক্ষা নিয়েই বোধহয় ‘রূপবান’ তৈরি করেন সালাহ্উদ্দিন।