গ্রামের পাড়ার মোড় বা হাটবাজারেই শুধু নয়, খোদ রাজধানী ঢাকা শহরেই এমন অনেক শিক্ষিত ও সচেতন মানুষও এখন অ্যান্টিবায়োটিক কিনতে কোনো রেজিস্টার্ড চিকিত্সকের দ্বারস্থ হতে চান না। ওষুধের ফার্মেসিতে থাকা কোনো ওষুধ বিক্রেতার পরামর্শেই ওষুধ কেনার কাজটি সেরে ফেলেন এবং ডোজ শেষ না করে মধ্যপথেই ওষুধ খাওয়া বন্ধ করেন। একজন গ্রাম্য দিনমজুর থেকে শুরু করে রাজধানীর উচ্চ শ্রেণির শিক্ষিত মানুষটিও অবলীলায় এ কাজটি করে যাচ্ছেন। শুধু মানুষের দেহেই অ্যান্টিবায়োটিকের ইচ্ছেমতো ব্যবহার হচ্ছে—ব্যাপারটি কেবল তা-ই নয়; সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে, এই অযাচিত অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নানাভাবে ছড়িয়ে পড়ছে খামারে লালনপালন করা পশু-পাখির শরীরেও।
বিশ্ব জুড়ে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেসিস্ট্যান্স একটি স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে এবং জীবাণুসমূহ অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করেই চলেছে। জীবাণুসমূহ বহু প্রকার অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতিরোধী হয়ে পড়েছে। ফলে কম বা বেশি দামি সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক সংক্রমণ চিকিত্সায় অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে; বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এ ধরনের রোগজীবাণু ব্যক্তির জন্য প্রাণঘাতী হওয়া ছাড়াও সমাজে ব্যাপক প্রাদুর্ভাব সৃষ্টি করতে পারে। উল্লেখ্য, World Health Assembly, 2015-Antimicrobial Resistance Preparedness, Surveillance & Response Agenda হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। তা ছাড়াও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ পলিসি ও নির্দেশিকা প্রণয়নপূর্বক অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ওপর কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে এরই মধ্যে কৌশলপত্র, কর্মপরিকল্পনা, ক্লিনিক্যাল গাইডলাইন ইত্যাদি প্রণয়ন করেছে। ইতিমধ্যেই জাতীয় কর্মকৌশলপত্র প্রণয়ন করা হয়েছে যেখানে ২০২২ সাল পর্যন্ত সরকারের উদ্যোগসমূহ ঠিক করা হয়েছে। এ বিষয়ে একটি সারভেইল্যান্স চলমান রয়েছে এবং সারভেইল্যান্সটিকে আরো বেগবান করার জন্য কার্যক্রম চলমান রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে রেফারেন্স ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
সমন্বিতভাবে ঔষধ প্রশাসন, প্রাণিসম্পদ, মত্স্য অধিদপ্তর এবং অন্যান্য সহযোগী প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতের প্রচেষ্টা চলমান। সব পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য IPC গাইডলাইন প্রণয়ন করা হয়েছে। গত ছয় মাসের মধ্যেই প্রায় ৬ হাজার চিকিত্সক-নার্সকে এই বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং সব হাসপাতালে আইপিসি কমিটি তৈরি করা হয়েছে। ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল বিক্রয় নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সহনীয় মাত্রায় আনয়নের জন্য চিকিত্সকসহ সব পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের সচেতনতা বৃদ্ধি করা অতীব প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যে বিভিন্ন অ্যাডভোকেসি সভার আয়োজন করা হয়েছে। কেননা, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স প্রতিরোধে আমাদের সবারই ভূমিকা রয়েছে। প্রেসক্রিপশনের মাধ্যমে চিকিত্সক যেমন ভূমিকা রাখতে পারেন, তেমনি যারা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করছেন তারাও ভূমিকা রাখতে পারেন। অযথা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার ক্ষতির কারণ। শুধু রেজিস্টার্ড চিকিত্সকের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক ক্রয় ও সেবনের মাধ্যমে রেজিস্ট্যান্সের হার অনেকাংশে কমানো সম্ভব। সরাসরি ওষুধের দোকানে হাতুড়ে ও অন্য কোনো রোগীর, প্রেসক্রিপশন মোতাবেক অ্যান্টিবায়োটিক ক্রয় বা সেবন একেবারেই কাম্য নয়। যথোপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারই আমাদের ভবিষ্যত্ সন্তানদের রেজিস্ট্যান্স জীবাণুর মরণঘাতী সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।
শেষ কথায় এটিই বলা যায় যে, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ব্যবহারে কেবল মেডিক্যাল পেশায় নিয়োজিত মানুষকেই সচেতন হতে হবে তা নয়; বরং সাধারণ মানুষের মনে উপলব্ধির জায়গাটি নিয়মতান্ত্রিকভাবে উন্নতি করে যৌক্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে দেশের নাগরিক সমাজকেও দায়িত্ব নিতে হবে। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে শুধু অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সাধারণ মানুষকেও সচেতন করতে হবে। আর সব মানুষের সচেতনতার জন্য ব্যাপক প্রচারণার বিকল্প নেই।
n লেখক : তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়