জলবায়ু আন্দোলনে নতুন মোড়

গত দেড় দশকে বিশ্বনেতৃবৃন্দ বহু রাত জেগে, তর্ক-বিতর্ক করে দৈত্যকায় এই দুর্যোগ মোকাবিলায় বহুপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধ ঘোষণা করে। যা প্রমাণ করে বিশ্বনেতৃবৃন্দের মধ্যে এই মনোভাব দেরিতে হলেও সৃষ্টি হয়েছিল যে, জলবায়ু পরিবর্তনগত কারণে আসন্ন আপদ ঠেকাতে এবং সর্বোপরি পৃথিবীর অস্তিত্ব রক্ষায় আন্তর্জাতিক সমন্বয় দরকার। কিন্তু সেই সুসংহত এবং বহুল প্রত্যাশিত উদ্যোগে ছেদ টানতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেন বদ্ধপরিকর ছিলেন। তিনি প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েই ক্ষান্ত হননি, একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জীববৈচিত্র্য থেকে পুরো পৃথিবী যে অস্তিত্ব সংকটে আছে, তা কোনোক্রমেই মানতে রাজি নন। জলবায়ু পরিবর্তন যে একটি বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত বিষয়, সেটাও তিনি অজ্ঞতার বশবর্তী হয়ে ভুয়া বলে অস্বীকার করেন।

তাত্ত্বিকভাবে তুলনা করলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে যেমন পুরো ক্লাইমেট সেপ্টিক মনে হবে, অন্যদিকে ইলেক্টেড প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে ঠিক ততখানিই জলবায়ু আন্দোলনের ক্রীড়নক মনে হবে। সার্বিকভাবে বিচার করলে তাকে একজন পুরোদস্তুর পরিবেশবাদীই মনে হয়। তিনি যখন সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামার আমলে ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন তখন থেকেই তিনি বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বহুলাংশে সোচ্চার ছিলেন। সদ্য সমাপ্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে ফেরা এবং আগের চেয়ে পরিবেশ সুরক্ষায় দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করা তার নির্বাচনি ইশতেহার ছিল। বাইডেন-হ্যারিসের নির্বাচনি প্রচারণা ওয়েবসাইটে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও প্রাঞ্জল ভাষায় উল্লেখ ছিল বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায়, দূষণমুক্ত জ্বালানি এবং পরিচ্ছন্ন নদীর তারা কী কী করতে চান।

জো বাইডেনের বিজয় যে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু আন্দোলনকে আরো বেগবান করবে, তা নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই পরিবেশকর্মীরা বলে আসছিল। স্কুল স্ট্রাইক ফর ক্লাইমেট আন্দোলনের প্রধান এবং জলবায়ু সুরক্ষা আন্দোলনকর্মী সুইডিশ কিশোরী গ্রেটা থুনবার্গ টুইটবার্তায় সরাসরি জো বাইডেনকে সমর্থন করেন। তিনি লিখেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক লড়াইয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং সংগঠিত হোন এবং বাইডেনকে ভোট দিন।

 ট্রাম্পের প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার বিষয়টি ছিল তার জাতীয়তাবাদী ‘আমেরিকা প্রথম’ এজেন্ডার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং জাতিসংঘ জলবায়ু কর্মপ্রক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক নীতি-প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে একটি নাশকতা। সেই সঙ্গে তার এই অবস্থান অন্যান্য সর্বোচ্চ কার্বন নিঃসরণকারী দেশ ব্রাজিল, রাশিয়া, সৌদি আরব এবং অস্ট্রেলিয়াসহ কিছু পরিবেশ-প্রতিবেশের ক্ষতিসাধনকারী দেশসমূহকে আড়াল করে দিয়েছে; যা ক্রমেই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ভয়ানক অভিঘাত ডেকে আনছে। কিন্তু এ কথা অকপটেই বলা যায়, বাইডেন ক্ষমতায় আসায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নতুন করে গতি সঞ্চার হবে। তার আঁচ করা গেছে নির্বাচিত হওয়ার পর বিভিন্ন বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে জলবায়ুসংক্রান্ত ইস্যু তুলে আনাতে। আমেরিকা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কার্বন নিঃসরণকারী (চীনের পর) হিসাবে এখনো অনেক প্রভাবশালী।

গত চার বছরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জলবায়ু পরিবর্তনসহ নদী সুরক্ষা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রভৃতি পরিবেশ-প্রতিবেশসংক্রান্ত ইস্যুতে গত এক শতকে গড়ে ওঠা বৈশ্বিক ঐক্যকে তছনছ করে দিয়েছে। এখন এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়ে পড়া বিপর্যয়কর উষ্ণতা এড়ানোর সুযোগ বিশ্বকে গ্রহণ করতে হলে অবশ্যই ভয়াবহ নির্গমন কমিয়ে আনায় সবাইকে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। যেখানে জো বাইডেন হতে পারেন মধ্যমণি। নড়বড়ে হয়ে যাওয়া ঐক্যকে দৃঢ় করতে হবে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে এটা প্রতীয়মান হয়েছে যে, জলবায়ু আন্দোলনকর্মীরা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পক্ষে সমর্থন আদায়ে কতটা সক্রিয় হতে পারেন। বৈশ্বিক উষ্ণতা একটি বাস্তবতা এবং কোনো অনুমান কিংবা মতাদর্শের বিষয় না, তা পরিবেশবাদীরা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। 

একই সঙ্গে বাইডেন-হ্যারিস জুটি তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন যে, জলবায়ু ইস্যুটি তাদের দলে কতটা ঐক্যবদ্ধ শক্তি। এখন নির্বাচন শেষ হয়েছে এবং বাইডেন ও অন্যান্য আইনপ্রণেতার ওপর যতটা সম্ভব জোরে চাপটা অব্যাহত রাখতে হবে। ফিরিয়ে আনতে হবে চার বছরে ফিকে হয়ে যাওয়া ঐক্যকে। তবেই বিশ্ব অগ্রগামী হবে জলবায়ু পরিবর্তনগত আপদ ও বিপর্যয় মোকাবিলায়।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়