শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি উন্নয়ন করিতে পারে না। এই শিক্ষা হইতে হইবে সুশিক্ষা ও গবেষণামূলক। উন্নয়নের সোপান হিসাবে উচ্চশিক্ষায় গবেষণা খাতকে আমাদের অবশ্যই প্রাধান্য দিতে হইবে। এই ব্যাপারে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাকেন্দ্রগুলির প্রতি সুনজর দেওয়ার সময় আসিয়াছে। কিন্তু সত্যি বলিতে কি, এই ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থা আশানুরূপ নহে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অনেক গবেষণাকেন্দ্র রহিয়াছে। কিন্তু সেইখানে ঠিকমতো গবেষণা হয় না। গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত গবেষক পাওয়া যায় না। গবেষণার জন্য যেই অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়, তাহাও অতি সামান্য। তাহার পরও সেই অর্থ ঠিকমতো খরচ করা হয় না।
এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অন্তত ৪০ শতাংশ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত নহেন। তাহারা শুধু ক্লাস নেওয়া, বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, পরীক্ষা গ্রহণ, খাতা নিরীক্ষণ, ফলাফল তৈরি ও অন্যান্য শিক্ষাসংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকেন। কেহ-বা আবার প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেন বা বিভিন্ন সংস্থায় কনসালট্যান্সি করেন। অন্য যাহারা গবেষণায় যুক্ত রহিয়াছেন, তাহাদের কত শতাংশ ভালো মানের গবেষণা করিতেছেন তাহা প্রশ্নাতীত নহে। কেননা বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে বর্তমানে মৌলিক গবেষণা নাই বলিলেই চলে। এই পরিস্থিতি হইতে উত্তরণ ঘটাইতে হইলে বিশ্ববিদ্যালগুলিতে গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করিতে হইবে। গবেষণা খাতে অর্থবরাদ্দ যেমন বাড়াইতে হইবে, তেমনই তাহার সঠিক ব্যবহারও নিশ্চিত করিতে হইবে। গবেষণার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ যেন ফিরত না যায় বা তাহা যেন অপচয়ও না হয়। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হইল, দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়িয়া চলিলেও সেইখানে গবেষণামূলক কার্যকম খুবই হতাশাজনক। ২০১৮ সালে ৯২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করিলেও তন্মধ্যে ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা খাতে এক টাকাও ব্যয় করে নাই। সর্বোচ্চ ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করিয়াছে মাত্র ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয়। দুই-তৃতীয়াংশই নামকাওয়াস্তে এই খাতে ব্যয় দেখাইয়াছে। শুধু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় নহে, ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ছয়টি গবেষণা খাতে ২০১৮ সালে কোনো ব্যয় করে নাই। ২০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রকাশনাই নাই। ইহা হইতে স্পষ্টত বুঝা যায়, গবেষণা খাতে আমরা কতটা পিছাইয়া আছি।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় হইতেছে জ্ঞানচর্চার প্রধান কেন্দ্র। নূতন নূতন জ্ঞানচর্চায় এই সকল উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দিকপালের ভূমিকা পালন করিবার কথা। এই জন্য এই সকল প্রতিষ্ঠানের মূল কাজই হওয়া উচিত গবেষণা করা। গবেষণা খাতে অর্থবরাদ্দ বৃদ্ধি করা, ভালো মানের গবেষণাকে উত্সাহিত করা, জার্নালগুলির মানোন্নয়ন করা ইত্যাদির ব্যাপারে আমাদের গুরুত্ব দিতে হইবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে গবেষণার জন্য পোস্ট তৈরি করিতে হইবে। তাহাদের কাজই হইবে শুধু গবেষণা করা, যাহাদের তত্ত্বাবধানে পিএইচডি ও পোস্ট ডক্টরেট গবেষকগণ কাজ করিবেন। গবেষণার মানোন্নয়নে পৃথক নীতিমালা প্রণয়ন করা যাইতে পারে। গবেষণাকে প্রাধান্য দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রমোশন নীতিমালায়ও পরিবর্তন আনয়ন প্রয়োজন। বিভিন্ন অনুষদে প্রয়োজন গবেষক প্যানেল তৈরি করা। আমাদের মেধাবী ছেলেমেয়েরা বিদেশে গবেষণা করিতে গিয়া আর দেশে ফিরিয়া আসিতেছে না। তাহাদের সুযোগ-সুবিধা দিয়া দেশে ফিরিয়া আনিবার ব্যবস্থা করিতে হইবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে জুনিয়র ও সিনিয়র রিসার্চ ফেলো সৃষ্টি করিতে হইবে। ইউজিসির কাজ হইবে নিয়মিত মনিটরিং করা। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নহে, ইহার বাহিরে সরকারি-বেসরকারি যেই সকল গবেষণা সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান রহিয়াছে, জাতীয় স্বার্থে সেই সকল প্রতিষ্ঠানের উন্নতিকল্পে ও গবেষণার মানোন্নয়নে আমাদের সর্বাত্মক উদ্যোগ নিতে হইবে।