প্রযুক্তিবিহীন ভবিষ্যত্ প্রজন্ম অন্ধকারস্বরূপ

বর্তমান যুগ প্রযুক্তিনির্ভর যুগ। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। প্রযুক্তি ছাড়া বর্তমান বিশ্বকে চিন্তাই করা যায় না। প্রযুক্তির কল্যাণে যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক সহজ ও দ্রুততর হয়েছে। বিশ্বের সব প্রান্তের খবরা-খবর  জানা  এখন অনেক সহজতর হয়েছে। কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের ব্যবহার মানুষের জীবনকে গতিময় করেছে। দৈনন্দিন প্রায় প্রতিটি কাজকর্মের সঙ্গে প্রত্যক্ষ, পরোক্ষভাবে জড়িয়ে গেছে প্রযুক্তি। আধুনিক জীবনযাপনের তাগিদে প্রযুক্তির প্রতি একধরনের ভালোবাসা তৈরি হচ্ছে সবার। প্রযুক্তি খাতে নতুন সব সম্ভাবনা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন দশক। নতুন দশককে বলা হচ্ছে  চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের। সংস্করণ হিসেবে ডাকা হচ্ছে ৪.০ নামে। এরই মধ্যে সফটওয়্যার খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। সময়ের সঙ্গে এই গতি আরো বাড়বে বলেই অনুমিত হচ্ছে।  বাংলাদেশের অনেক অভিনব উদ্যোগ দেশের বাইরেও সমাদৃত ও পুরস্কৃত হয়েছে। দেশের বাইরে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন সফটওয়্যার নির্মাতারা। এক্ষেত্রে  বর্তমান সরকার ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ে তুলতে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, সেগুলো সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। শুধু শহরেই নয়, বরং জেলা-উপজেলা সদর ছাড়িয়ে গ্রাম, এমনকি প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলেও তথ্যপ্রযুক্তি সেবা পৌঁছে দিয়েছে সরকার। সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে সহযোগী হয়ে কাজ করছে অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড  ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)। তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলাদেশ ভালো করছে এবং যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে বলেই  ওয়ার্ল্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সার্ভিসেস অ্যালায়েন্স (উইটসা) ঢাকাকে বেছে নিয়েছে বিশ্ব সম্মেলন করার জন্য। বাংলাদেশের ‘ভিশন:২০২১’ রয়েছে, যার মাধ্যমে আইসিটিতে দেশ এগিয়ে চলছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবিলায় বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নে জোর দিয়েছে। একটি জাতীয় দৈনিকের তথ্যানুযায়ী  বর্তমানে দেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতের আয় ১০০ কোটি ডলার। ২০২১ সাল নাগাদ এ আয় ৫০০ কোটি ডলারে উন্নীত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য দেশব্যাপী ২৮টি হাই-টেক পার্ক করা হয়েছে। বাংলাদেশের এখন একটাই ইচ্ছা  অর্থনৈতিক-সামাজিক উন্নয়নে  প্রযুক্তি ব্যবহার করা। এক্ষেত্রে শিক্ষা অগ্রাধিকার খাত। শিক্ষা খাতের মাধ্যমে  এ ইচ্ছা পূরণ করা সম্ভব বলে অনুমিত হচ্ছে। সে লক্ষ্যে উচ্চ শিক্ষায় নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি, দেশের সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহের অবকাঠামো নির্মাণ, বছরের প্রথম দিনে সাড়ে ৪ লাখ শিক্ষার্থীর হাতে পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়া,  অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তির পরিধি বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন উল্লেখযোগ্য।

করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বর্তমানে অনেক পেশাতেই অনলাইন সেবা চালু করেছে। করোনার এই সময়ে  ব্যাংক,  বীমা এমনকি  ই-কর্মাস, টেলি মেডিসিন, ডিজিটাল বিপণন সেবা থেকে শুরু করে ডেলিভারি সুবিধা প্রদান করা মাধ্যমগুলোতে ডিজিটাল প্রযুক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যবহূত হচ্ছে। প্রযুক্তির সুবিধা কাজে লাগিয়ে দেশে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাও বাড়ছে। তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা বাড়ায়  ঘরে বসেই এখন অনলাইন ব্যবসা পরিচালনা করা যাচ্ছে। বাজার সম্প্রসারণে ই-কর্মাসসহ নানা বিষয়ে উদ্যোক্তারা প্রশিক্ষণও নিচ্ছেন। এমনকি  ঘরে বসেই এখন অনলাইনে নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার ও বিলাসিতার সামগ্রীও কেনাকাটা করা  যায় এবং সুনিশ্চিতভাবে ডেলিভারি সুবিধাও পাওয়া যায়। প্রযুক্তির কল্যাণে  সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে আবেদনও প্রার্থী নিজেই করতে পারে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, করোনার সময়কালে প্রযুক্তি ব্যবহারের জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে লক্ষণীয়।  প্রযুক্তিবিহীন ভবিষ্যত্ প্রজন্ম যে অন্ধকারস্বরূপ করোনা ভাইরাস তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে এবং প্রতিনিয়ত প্রযুক্তির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা  মারাত্মকভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছে। 

তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের নেতিবাচক দিকও রয়েছে। এ বিশাল জনগোষ্ঠীর প্ল্যাটফরমে  নানা সমস্যারও সম্মুখীন হতে হচ্ছে। প্রতারকশ্রেণি প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহজে লোক ঠকাচ্ছে,  অনলাইনে অর্ডার করা পণ্য ডেলিভারিতে বিলম্বসহ এক পণ্য দেখিয়ে অন্য পণ্য দিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে থাকে। দীর্ঘ সময় ডিভাইসে থাকার ফলে অনেকেরই শারীরিক-মানসিক সমস্যা হয়। বিশেষ করে ছোটদের মাঝে ডিভাইস নেশার প্রবণতা দেখা দেয়। পড়ার ছলে,  বিনোদন ও অবসর কাটাতে ল্যাপটপ, কম্পিউটার, স্মার্টফোন ইত্যাদি ডিভাইসের দিকে অনেক ক্ষণ তাকিয়ে থাকার ফলে অনেকের চোখেরও সমস্যা হয়।  এছাড়া ইন্টারনেটের উন্মুক্ত  দুনিয়ায় কোনো কিছুই হাতের নাগালের বাইরে নয়।  সন্তান  প্রযুক্তির ইতিবাচক না নেতিবাচক দিক গ্রহণ করছে,  সেদিকে অভিভাবকদের  সচেতন থাকা জরুরি। প্রযুক্তির এসব নেতিবাচক দিকগুলোতে লক্ষ্য রাখতে হবে অভিভাবক, পরিবার ও সমাজকে। তবেই নিরাপদ ডিজিটাল প্রযুক্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ,

ইডেন মহিলা কলেজ