গর্ভেই বিক্রি হচ্ছে শিশু!

মেয়েটির বয়স এখনো ১৮ হয়নি। রাজশাহী রেল স্টেশনের গণশৌচাগারের পেছনের ফাঁকা জমিতে নির্জনতা ঘিরেই তার কথিত সংসার। গর্ভে বেড়ে উঠছে শিশু। কিন্তু ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই পেটের শিশুকে বিক্রি করে দিয়েছে ঐ কিশোরী। জানা গেছে, নগরীর এক নিঃসন্তান দম্পতি ১০ হাজার টাকায় ঐ কিশোরীর পেটের সন্তানকে কিনে নিয়েছেন। সন্তানসম্ভবা কিশোরীকে ঐ দম্পতির পক্ষ থেকে প্রতিদিন তিন বেলা খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়। সন্তান ভূমিষ্ঠের পর কিশোরী পাবে নগদ ১০ হাজার টাকা। এখন সে ঐ অপেক্ষায় নিশ্চিন্তেই আছে।

১৮ বছর না পেরোনো আরেক কিশোরীর পেশাও পূর্বের কিশোরীর মতো। সে-ও একইভাবে গত রমজানে তার শিশুকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে। ভদ্রা এলাকার কামাল নামের এক গ্যারেজের কর্মী শিশুটিকে কিনে নেন। এভাবেই রাজশাহীতে চলছে গর্ভের সন্তান বেচাকেনা। তবে দাম নির্ধারণ হয়ে থাকে লিঙ্গভেদে। মেয়ে হলে কম আর ছেলে হলে বেশি দাম। সীমা নামের এক নারী এই শিশু বেচাকেনা সমন্বয় করেন। তিনি তার নিজের সন্তানকেও বিক্রি করেছেন। শনিবার পুলিশ তাকেসহ তিন নারীকে গ্রেপ্তার করেছে, যাদের মধ্যে একজন ক্রেতা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজশাহীতে যারা সন্তান ধারণ করে গর্ভে বা জন্ম দিয়ে বিক্রি করছে, তারা নগরে ভ্রাম্যমাণ যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করে। এই সিন্ডিকেটে বেশ কয়েক জন রয়েছে, যাদের মধ্যে কয়েক জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে। আর বিক্রি হয়ে যাওয়া শিশুদের শেষ পরিণতি কী হচ্ছে, তার খবর কেউ রাখছে না বা এর কোনো হিসাবও কারো কাছে নেই।

গত শনিবার দুপুরে রাজশাহী স্টেশন এলাকায় সন্তানসম্ভবা ঐ কিশোরীর সঙ্গে কথা হলে সে জানায়, তার বাড়ি বরিশালে। শিশুকালে তার এই শহরে পা পড়ে। নিজের বাবা-মা সম্পর্কে তার জানা নেই। তার মতো আরো অনেক কিশোরী ও নারী রাজশাহী স্টেশনের পশ্চিমে অবস্থিত প্রাইমারি স্কুলের পেছনে কথিত সংসার পেতে বসেছে। কে তার গর্ভের শিশুর বাবা তা সে জানে না। এই সন্তানের দায়িত্ব সে নিতে পারবে না। তাই গর্ভে থাকতেই তার সন্তানকে বিক্রি করে দিয়েছে।

এদিকে চলতি বছরের মে মাসে সন্তান বিক্রি করেছিল আরেক কিশোরী। শনিবার সকালে সেই কিশোরীর সঙ্গে ভদ্রা রেল বস্তিতে কথা হলে সে জানায়, তার স্বামী ছিল। তবে এখন সে একা। স্টেশন ঘিরে সে-ও সংসার পেতে বসেছে। খদ্দেরপ্রতি তার আয় ১০০ টাকা। সেই সঙ্গে কোনো নিঃসন্তান দম্পতি যদি তাকে অনুরোধ করে, তবে সে ঐ দম্পতির জন্য ১০ থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে শিশু জোগাড় করে দেয়। এই কিশোরীর ভাষায়, কন্যাশিশু হলে রেট কম আর ছেলে শিশুর রেট বেশি। আবার গয়ের রং, স্বাস্থ্যভেদেও দাম কমবেশি হয়।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার ভদ্রা এলাকার শ্যামলী নামের আরেক নারী তার পাঁচ মাসের এক শিশুকে বিক্রি করে মাত্র ১২ হাজার টাকায়। ঐ শিশুকে কিনে নেন ঢাকার জান্নাতি নামের এক গার্মেন্টস কর্মী। বিক্রির পর থেকে শিশুর সেই মা শ্যামলীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে শিশুকে কিনে বিপদে পড়েছেন ঐ নারী। ক্রয়কৃত শিশু আদৌ শ্যামলীর, নাকি চুরি করা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। বিষয়টি জানাজানির পর শনিবার দুপুরে তাকেসহ তার খালা রোকেয়া ও মধ্যস্থতাকারী কিশোরীকে তুলে নিয়ে যায় রেল পুলিশ। রাজশাহী রেলওয়ে থানার পুলিশ বিকেলে তাদের বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা দিয়ে চিফ মেট্রোপলিটন আদালতে হাজির করে। আদালত তাদের জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেয় এবং শিশুকে ছোটমণি নিবাসে পাঠায়।

গ্রেফতারের আগে জান্নাতি ও তার স্বামীর সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, ১২ বছরের সংসারে তাদের কোনো সন্তান নেই। তাই তারা ঠিক করেন অনাথ কোনো শিশুকে দত্তক নেওয়ার। ১০ থেকে ১২ দিন আগে জান্নাতি রাজশাহীতে ছোট বনগ্রাম এলাকায় তার বোনের বাড়িতে বেড়াতে আসেন। এর মধ্যে শুক্রবার রাতে ভদ্রা রেল বস্তিতে বসবাসকারী তার খালা রোকেয়া তাকে জানান, একটা শিশু পাওয়া গেছে। জান্নাত দ্রুত ভদ্রায় পৌঁছান এবং শিশুকে ১২ হাজার টাকায় কিনে নেন।

রাজশাহী রেলওয়ে থানার ওসি মোহাম্মদ শাহ কামাল জানান, গ্রেফতারকৃতরা যে শিশুকে কিনেছেন তা আসলে কার কাছ থেকে তা তারা বলতে পারেনি। অর্থাত্, শিশুর প্রকৃত মা কে তারা জানাতে বা দেখাতে পারেননি। এ কারণে তাদের বিরুদ্ধে শিশু অপহরণের মামলা দেওয়া হয়েছে।