প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, স্বল্পমূল্যে পণ্য ও জনপরিবহন নিশ্চিত করতে সারাদেশে শক্তিশালী যোগাযোগ নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে সরকার দেশব্যাপী রেল যোগাযোগ আরো সম্প্রসারিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি বলেন, জাতির পিতা বলেছিলেন, বাংলাদেশ হবে প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড। অর্থাত্ বাংলাদেশ হবে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে একটা সেতুবন্ধন। আর সেই সেতুবন্ধন করতে গেলে আমাদের ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গে সংযোগ করতে হবে।
গতকাল রবিবার সকালে যমুনা নদীর ওপরে বঙ্গবন্ধু সেতুর উজানে ১৬ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা ব্যয়ে ডাবল লেনের ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের পৃথক ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু’র ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকালে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘রেলকে আরো শক্তিশালী করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। সারাদেশে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের জন্য রেল নেটওয়ার্ক আমরা সৃষ্টি করব। যাতে অল্প খরচে পণ্য পরিবহন এবং মানুষের যাতায়াতের অনেক সুবিধা হয়।’
প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিমপাড় সিরাজগঞ্জের সয়দাবাদে আয়োজিত মূল অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করেন। জাপান ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে ১৬ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা ব্যয়ে এই রেল সেতুটি নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে জাইকা। এর নির্মাণকাজ ২০২৫ সাল নগাদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এই সেতু দিয়ে ১০০ কিলোমিটার বেগে একই সঙ্গে দুটি ট্রেন চলাচল করতে পারবে। ফলে সময় সাশ্রয় হওয়ার পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং ব্যবসা-বাণিজ্যেরও প্রসার ঘটবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সারা বাংলাদেশে আমরা রেলের নেটওয়ার্ক তৈরি করতে চাচ্ছি। একেবারে ঢাকা থেকে বরিশাল, পটুয়াখালী হয়ে পায়রা বন্দর
পর্যন্ত রেললাইন নিয়ে যাব। তার সমীক্ষা শুরুর ব্যাপারে আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, সেখান থেকে কক্সবাজার ও টেকনাফ পর্যন্ত যাবে রেললাইন।’ তিনি বলেন, ‘রেলপথ, সড়কপথ, আকাশপথ এই সবগুলোর উন্নয়নেই আমরা ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। তাতে আমাদের দেশের অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হবে। তাছাড়া ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গে যখন আমরা সংযুক্ত হয়ে যাব, এটাও আমাদের জন্য বিরাট কাজ হবে।’ তিনি নিজের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু সেতুর সঙ্গে রেল সংযোগ প্রদান করেন উল্লেখ করে বলেন, আর এখন দাতাগোষ্ঠীই সেখানে পৃথক একটি রেলসেতু করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন।
শেখ হাসিনা দেশের উন্নয়নে সকলকে আন্তরিকতার সঙ্গে স্ব-স্ব দায়িত্ব পালনের পাশপাশি করোনা ভাইরাস থেকে রক্ষা পাবার জন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, করোনা ভাইরাস যাতে আমাদের দেশের মানুষের ক্ষতি করতে না পারে, তার জন্য যা যা করা দরকার আমরা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তবে সকলেই স্বাস্থ্য সুরক্ষার নিয়মগুলো মেনে চলবেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রেলপথ মন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন। বাংলাদেশে জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকী অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব সেলিম রেজা স্বাগত বক্তৃতা করেন। মুখ্য সচিব ড.আহমদ কায়কাউস গণভবন প্রান্ত থেকে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। গণভবন প্রান্তে এবং মূল অনুষ্ঠানস্থলে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশী, স্থানীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ, জাইকার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রেলপথ মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দ, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু রেলওয়ে সেতুর ওপর একটি ভিডিও চিত্র প্রদর্শিত হয়।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতায় দাতাগোষ্ঠীর প্রেসক্রিপশনে বিএনপির রেল বন্ধ করে দেওয়ার প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘রেলকে প্রায় গলাটিপে হত্যা করতে গিয়েছিল বিএনপি সরকার। আমরা ক্ষমতায় এসে তাকে জীবিত করেছি। এখন রেলই মানুষের সব থেকে বড় ভরসা।’ তিনি আরো বলেন, জাপান সরকার পদ্মা সেতুর বর্তমান স্থলে ফিজিবিলিটি স্টাডি শেষ করার পর তার সরকার ২০০১ সালে সেখানে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেও পরবর্তীতে খালেদা জিয়া সরকার সে সেতুর নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর থেকে এ পর্যন্ত নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ আল্লাহর রহমতে প্রায় শেষ পর্যায়ে এসেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘সবসময়ই জাপান সরকার আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। এজন্য বিশেষভাবে আমি জাপান সরকারকে ধন্যবাদ জানাই।’ এসময় তিনি দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু উল্লেখ করে তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।