কত সুখে রহিয়াছে বাংলাদেশের মানুষ? তাহার চাইতেও গুরুতর প্রশ্ন—এই বিশ্বের পরাশক্তিরা কতখানি চাপের মধ্যে রাখিয়াছে ছোট ছোট দেশগুলিকে? সম্প্রতি ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা ও জনমত জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালাপের একটি বার্ষিক প্রতিবেদনে জানানো হইয়াছে—বিশ্বের সর্বনিম্ন ইতিবাচক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দেশগুলির তালিকায় অবস্থান করিতেছে বাংলাদেশ। মাত্র ৫৫ স্কোর লইয়া সর্বনিম্ন ইতিবাচক অভিজ্ঞতার ১২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। এই ১২টি দেশের মধ্যে ৩৮ স্কোর লইয়া সবচাইতে নিচে রহিয়াছে আফগানিস্তান।
বিশ্বের ১৪৫টি দেশের পৌনে দুই লক্ষ মানুষের সাক্ষাত্কারের ভিত্তিতে তৈরি করা হইয়াছে এই প্রতিবেদন। আপনি গতকাল কতখানি বিশ্রাম পাইয়াছেন, নিজের জগতে কতখানি সম্মান রহিয়াছে বলিয়া মনে করেন, কতটা হাসি-আনন্দে থাকেন আপনি, প্রতিদিন ভালো বা মজার কোনো না কোনো কাজ করিয়াছেন কি না, গতকাল নূতন কিছু শিখিয়াছেন কি না, গত দিনটি কতটুকু আনন্দে কাটিয়াছে—এই রকম ইতিবাচক প্রশ্নমালার সাহায্যে বুঝিবার চেষ্টা করা হইয়াছে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা। ইহার বিপরীতে নেতিবাচক প্রশ্নের মাধ্যমে বুঝার চেষ্টা করা হইয়াছে ঐ নির্দিষ্ট দেশটির মানুষেরা কতখানি নেতিবাচক অভিজ্ঞতায় ডুবিয়া রহিয়াছে। যেমন—গতকাল কোনো শারীরিক কষ্ট অনুভব করিয়াছেন কি না, উদ্বিগ্ন হইয়াছেন কি না, বিষণ্নতায় ভুগিয়াছেন কি না, চাপ অনুভব করিয়াছেন কি না, ক্রোধ জাগিয়াছে কি না—এমন পাঁচটি নেতিবাচক প্রশ্নের মাধ্যমে অন্তরমহলের খবর বুঝিতে চেষ্টা করিয়াছে গ্যালাপ। জরিপটি করা হইয়াছে করোনাকালের পূর্বে। ইহা ঠিক যে, অনেক মনোবিজ্ঞানীর ভাষ্য অনুযায়ী ‘সুখ’ আসলে ‘স্টেট অব মাইন্ড’। তবে আমরা যত তথাকথিত সভ্য এবং আধুনিক হইতেছি, ততই যেন স্বস্তিময় জীবন চলিয়া যাইতেছে বহু যোজন দূরে। সুখে বা স্বস্তিতে থাকিবার জন্য এই সময়ে তাই গবেষণাও হইতেছে বিস্তর। এমনই একটি গবেষণার কথা কয়েক বত্সর পূর্বে জানাইয়াছে যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির গবেষকরা বলিয়াছেন—সুখী হওয়াটা একটি চর্চার বিষয়। অর্থাত্ একজন মানুষের মৌলিক চাহিদা মিটাইবার মতো সকল কিছু থাকিলেও তিনি সুখী নাও হইতে পারেন। আবার কাহারো খুব সামান্য কিছু থাকিলেও তিনি সুখী হইতে পারেন। কিন্তু বর্তমানের এই বিশ্বায়নের যুগে সুখ কেবল ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছা কিংবা মনের ওপর নির্ভর করে না। এই ক্ষেত্রে একজন মানুষ কোন পরিবেশে বাস করিতেছেন, তাহা সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, এই নেতিবাচক অভিজ্ঞতার নেপথ্যে রহিয়াছে পরাশক্তিদেরও বিশেষ ভূমিকা। যেমন—গ্যালাপের জরিপে দেখা গিয়াছে পরাশক্তিদের দ্বারা নিষ্পেষিত দেশগুলিই প্রধানত খারাপ অভিজ্ঞতার মধ্যে রহিয়াছে। যেমন—ইরাক, রুয়ান্ডা, আফগানিস্তান, লেবানন, সিরিয়া, সিয়েরা লিওন, ইরান প্রভৃতি দেশ।
পরাশক্তিধরদের মধ্যে অনেকেই মহাভারতের দুর্যোধনের ছায়া দেখিতে পান। মহাভারতে দুর্যোধন যখন আত্মীয়দের হটাইয়া অখণ্ড রাজ্য অর্জন করিয়াছিলেন তখন তাহার পিতা ধৃতরাষ্ট্র জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন—এখন কি হইয়াছ সুখী? দুর্যোধন তখন দম্ভ ভরিয়া বলিয়াছেন—‘সুখ চাহি নাই মহারাজ!/ জয়, জয় চেয়েছিনু, জয়ী আমি আজ।’ বিষয়টি চমত্কারভাবে উপস্থাপিত হইয়াছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গান্ধারীর আবেদন’ কবিতায়। সুতরাং বিশ্বের অনেক পরাশক্তিধরের নিকট দুর্যোধনের মতো জয়টাই মুখ্য, সুখ নহে। আর এইখানেই যত সংকট, যত নেতিবাচক অভিজ্ঞতা।