দ্য ক্যালাশ

অশ্বারোহী বাহিনী ঘাঁটি গাড়ার পর থেকে ‘খ’ নামের শহরটি যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। তার আগ পর্যন্ত নিদারুণ একঘেয়ে জীবন শহরটাকে ঘিরে ছিল। ঘটনাক্রমে একবার এ শহরে ঢুকে পড়ার পর এখানকার বিস্ময়কর বিষণ্ন চেহারার ছোট ছোট মাটির ঘরগুলোর দিকে চোখ পড়লে যে অনুভূতি হবে, কলম তা লিখতে বেঁকে বসবে। ভয়ানক অস্বস্তিতে পড়বে যে কেউ যেন এইমাত্র জুয়ায় সর্বস্ব হারিয়েছে বা অফিসে মারাত্মক এক ভুল করে বসেছে। বাড়িগুলোর আস্তরণ বৃষ্টিতে ভিজে কিছু জায়গায় দেয়াল থেকে খসে পড়েছে, একসময় যেগুলো ছিল সাদা রঙের এখন তা নোংরা দাগ-দাগ চেহারা নিয়েছে আর ছাদ হিসেবে ঝুলে আছে পুরনো নলখাগড়ার সারি।

দক্ষিণ রাশিয়ার শহরগুলোর যে ঐতিহ্য তা পুরোপুরি অনুসরণ করে এ অঞ্চলের পুলিশপ্রধান শহরের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য বহু বছর আগেই বাগানের সবগুলো গাছ কেটে ফেলেছেন। শহরে প্রায় কিছুই চোখে পড়বে না, অকস্মাত্ দেখা যেতে পারে ধুলোয় ভর্তি তুলতুলে বালিশের মতো একটি মোরগ রাস্তা পার হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই দগদগে কাদা হয়ে যায় ধুলোগুলো আর তখনি রাস্তার দখল নিয়ে নেয় শূকরের পাল। কিম্ভূত মুখ তুলে এমন ভঙ্গিতে এগুলো ঘোঁত্ ঘোঁত্ করতে থাকে যে, শহর ধরে এগিয়ে যাওয়া কেউ যত তাড়াতাড়ি পারে ঘোড়া ছুটিয়ে সরে যেতে পারলেই যেন বাঁচে।

কখনো কখনো প্রতিবেশি কোনো ভদ্রলোক, ডজনখানেক ভূমিদাসের মালিক, কিছুটা মালটানা কিছুটা যাত্রীটানা ধাঁচের গাড়িতে আটার বস্তা বেঁধে এ শহর পার হওয়ার সময় দুলকি চালে চলতে থাকা তামাটে ঘোড়ার গতি বাড়াতে চাবুক কষে। বাজারের চেহারা আরো করুণ। দর্জির দোকানটা বড় বেমানান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাশের গলিতে মুখ করে। এর সামনে রয়েছে দুই জানালার ইটের একটি বাড়ি, পনের বছরে একবারও হাত পড়েনি। একটু দূরে কাঠের তৈরি বড় আকৃতির বাজার স্টল, তাতে ব্রাশ টানা হয়েছে মাটি রঙের। একসময় এটাকে ধরা হতো একটি আদর্শ বাজার স্থাপনা। এ অঞ্চলের পুলিশপ্রধান যখন থেকে ডিনারের সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়তেন এবং প্রতি সন্ধ্যায় শুকনো বঁইচি ফলের তৈরি বিশেষ ধরনের পানীয়তে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন, তার আগে যুবক বয়সে এটা তৈরি করেছিলেন। বাজারের চারপাশে আর কিছুই চোখে পড়বে না, শুধু আকাশের দিকে মুখ তুলে চেয়ে থাকা কিছু খুঁটি ছাড়া। বাজারের মাঝখানে আছে কিছু শেড যেখানে সবসময় দেখা যাবে গোল কেকের কয়েকটি প্যাকেট, লাল পোশাকের এক শক্তসমর্থ মহিলা, সাবানের বার, কয়েক পাউন্ড তেতো বাদাম, কিছু সিসা, কিছু তুলা এবং দুজন দোকানদার—যারা ‘সেভেইকা’ খেলছে, অনেকটা ‘কুউটস’ খেলার মতো।

কিন্তু, অশ্বারোহী বাহিনীর আগমনে সবকিছুই পাল্টে গেছে। পথগুলোতে মানুষের আনাগোনা বেড়ে গেছে এবং কলকল করছে। প্রায়শ, ছোট ছোট ঘরগুলোর বাসিন্দারা দেখতে পায় মাথায় টুপি পরে লম্বা সুঠাম দেহের অফিসাররা এগিয়ে যাচ্ছে, বাড়ি ফেরার পথে তার সহকর্মীর সঙ্গে পদোন্নতির সম্ভাবনা, নতুন ধরনের এক তামাকের গুণাগুণ অথবা যান চালনার ঝুঁকি নিয়ে আলাপ করছে। সামরিক যান আজ হয়তো মেজরকে নিয়ে যাচ্ছে, কাল হয়তো দেখা যাবে লেফটেন্যান্টকে এবং সপ্তাহখানেক পর দেখা যাবে মেজরের ভৃত্য আবারও চাকায় গ্রিস মাখাচ্ছে। লম্বা দীর্ঘ যে ঝোপ বাড়িগুলোকে রাস্তা থেকে আলাদা করেছে, কখনো দেখা যাবে সেটা ঢেকে আছে সেপাইদের রোদে শুকানো টুপি দিয়ে, কোনো কোনো দরজার সামনে হয়তো ঝুলছে ধূসর শীতল আলখাল্লা। ‘খ’ নামের শহরটি এসব অফিসারের কাছে দারুণভাবে কৃতজ্ঞ।

শহরটির নাগরিক সমাজের মধ্যে আছেন একজন বিচারক, যিনি একজন পুরোহিতের স্ত্রীর সঙ্গে থাকেন এবং শহরের পুলিশপ্রধান, যিনি কিনা অত্যন্ত স্পর্শকাতর, কিন্তু প্রায়শ সকাল থেকে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা থেকে রাত অবধি ঘুমিয়ে থাকেন।

শহরের এই স্বাভাবিক প্রাণচাঞ্চল্য আরো বেড়ে যায় যখন অশ্বারোহী বাহিনীর কমান্ডিং অফিসার হিসেবে এক জেনারেল এই শহরে তার আবাস গাড়েন। আশপাশের অনেক ভদ্রলোক, যাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে কেউ কখনো ন্যূনতম সন্দেহ পোষণ করেনি, জড়ো হতে শুরু করে এখানে, হয় অফিসারদের সঙ্গে দেখা করার বাসনায় অথবা নতুন একটি জুয়ার খেলায় অংশ নিতে, যে খেলার নিয়ম-কানুন তখনো ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারেনি তারা। শহরে এই ভদ্রলোকেরা এমনভাবে দখল নেয় যেন তারা সেনাবাহিনীরই লোক বা তাদের ফায়-ফরমাশে জড়িত। চমত্কার একটি দিনে ঠিক কী কারণে জেনারেল মহোদয় বিশাল ডিনার পার্টি দিয়েছিলেন তা মনে করতে পারছি না বলে আমি দুঃখিত। সারা বাজারজুড়ে হৈচৈ পড়ে গিয়েছিল, এমনকি ওই বিচারক ও পুরোহিতের স্ত্রী সেদিন বিশাল পুডিং ও কেকের স্বাদ নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশে বাধ্য হয়েছিলেন। জেনারেলের বাড়ির ছোট্ট আঙিনা বিভিন্ন যাহবাহনে ভর্তি ছিল। অতিথিদের মধ্যে ছিলেন গণ্যমান্য ব্যক্তি, সেনা অফিসার এবং প্রতিবেশী অঞ্চলের ভদ্রলোকেরা।

এসব ভদ্রলোকদের মধ্যে ছিলেন দর্শনীয় পিথাগোরাস পিথাগোরাভিচ থার্টোকোউটস্কি, ‘খ’ শহরের অন্যতম অভিজাত, ডাকসাইটে বক্তা এবং খামার মালিক। তিনি নিজেও একসময় অশ্বারোহী বাহিনীতে ছিলেন, এমনকি সফল অফিসার হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং তার রেজিমেন্ট যেখানেই ঘাঁটি গাড়ত সেখানকার বিভিন্ন পার্টিতে হরহামেশাই হাজির হতেন তিনি। তামবফ এবং সিমবার্সক্ শহরের যুবতী মেয়েদের কাছে তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে। তার খ্যাতি আরো অনেক শহরেই ছড়িয়ে পড়ত যদি না তাকে, বলা হয়ে থাকে, ‘খুবই অস্বস্তিকর’ কোনো কারণে পদত্যাগ করতে না হতো। তিনি নিজে কি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন না কি তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল? আমি নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারব না, তবে যেটা সন্দেহাতীত তা হচ্ছে তাকে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছিল। যদিও, যে উচ্চ ধারণা তার সম্পর্কে পোষণ করা হতো তাতে এ ঘটনা কোনো ছাপ ফেলতে পারেনি।

থার্টোকোউটস্কি সবসময় মিলিটারি আদলের একটি কোট পরতেন, পায়ে থাকত অশ্বারোহীর বুটজুতা আর মুখে বিশাল গোঁফ। তিনি প্রায়ই বেরিয়ে পড়তেন বিভিন্ন মেলায়—যেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়ত সমগ্র দক্ষিণ রাশিয়া। এখানে থাকত সেবিকা, উঁচু লম্বা মেয়ে এবং স্থূলকায় ভদ্রলোকেরা গাড়ি চেপে এমন চেহারায় সেখানে হাজির হতেন যে, স্বপ্নেও কেউ তাদের উপযোগী পাত্রী হবার কথা চিন্তা করত না। তিনি সহজাতভাবে এমন সব জায়গার হদিস পেতেন যেখানে কোনো অশ্বারোহী বাহিনী ঘাঁটি গেড়েছে এবং অফিসারদের কাছে নিজের পরিচয় দিতে কখনোই ভুলে যেতেন না। তাদের দেখামাত্রই তিনি তার চার চাকার গাড়ি থেকে হাত নাড়তেন এবং দ্রুতই খাতির জমিয়ে ফেলতেন।

গত নির্বাচনের সময় তিনি ভদ্রলোকদের জন্য একটি বিশাল ডিনার পার্টি ছুড়েছিলেন যেখানে ঘোষণা দেন যে, মার্শাল নির্বাচিত হলে তিনি সব ভদ্রলোকদের সর্বাধিক সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করবেন। এক মহান অভিজাতের আচরণ অনুকরণ করেন তিনি। দুইশ ভূমিদাস এবং কয়েক হাজার রুবল যৌতুকের বিনিময়ে তিনি বিয়ে করেছেন এক সুন্দরী মহিলাকে। এই টাকা তত্ক্ষণাত্ ব্যয় হয়েছে ছ’টি দারুণ ঘোড়া, গিল্টি করা তামার তালা এবং একটি পোষা বানর কিনতে। পাশাপাশি তিনি নিয়োগ দিয়েছেন এক ফরাসি বাবুর্চি।  ভদ্রমহিলার অনুগত দুইশ ভূমিদাসসহ ওই ভদ্রলোকের অধিকারে থাকা দুইশও ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখা। অন্যভাবে বললে, সত্যিই তিনি অভিজাত। তিনি ছাড়া আরো কিছু ভদ্রলোক জেনারেলের পার্টিতে আমন্ত্রিত ছিলেন। কিন্তু তাদের কথা এখানে আলোচনা করা অনর্থক। অতিথিদের মধ্যে ছিলেন অশ্বারোহী বাহিনীর কর্নেল, স্থূলকায় মেজর। জেনারেল নিজেই শক্তপোক্ত এক লোক, অধঃস্তনদের কাছে ভালো অফিসার। গলার স্বর বেশ ভারী। ডিনারে আয়োজন ছিল অনেক, ছিল ক্যাভিয়ারের ডিমওয়ালা বড় স্টারজান, স্টারলেট, বড় পাখি বাসটাড, অ্যাসপারাগাস, তিতির পাখি, মাশরুম ইত্যাদি। এসব খাবারের গন্ধ ডিনারের চব্বিশ ঘণ্টা আগ থেকেই বাবুর্চির সুনাম ছড়াচ্ছিল। চার জন সৈন্য যারা তাকে সাহায্য করছিল সারারাত একটু বিশ্রামেরও সুযোগ পায়নি। লম্বা ঘাড়ওয়ালা অসংখ্য বোতল, সঙ্গে ছোট ছোট বোতল, লাল রঙের ফরাসি মদের গ্লাস হাতে অতিথিরা, গ্রীষ্মের দারুণ দিন, বিশাল খোলা জানালা, বরফসহ খাবারের বাসন সাজানো টেবিল, ভাঁজকরা শার্টপরা ভদ্রলোকদের উপস্থিতি, সতেজ ও উচ্চস্বরের কথাবার্তা, জেনারেলের গম্ভীর আওয়াজ, শ্যাম্পেনের বুদ্বুদ সবই দারুণভাবে চলছিল। সুখকর ঠাসা অনুভূতি নিয়ে অতিথিরা টেবিল ছেড়ে উঠল এবং তামাকের পাইপ জ্বালানোর পর কফির কাপ হাতে সবাই বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল।

‘আমরা এখন তাকে দেখব’, বলে উঠলেন জেনারেল। একজন তরুণ অফিসারকে ইশারায় তামাটে বর্ণের মাদী ঘোড়াটাকে সামনে আনার হুকুম দিলেন তিনি। ‘ভদ্রমহোদয়গণ, আপনারা নিজের চোখেই তাকে দেখবেন এখন।’

কথাগুলো বলার পর পাইপে এক দীর্ঘ টান দিলেন জেনারেল।

‘এখনো ভালোভাবে সেরে ওঠেনি সে। এই অভিশপ্ত জায়গায় ভালো একটা আস্তাবলও নেই। কিন্তু, দেখতে সে খুব খারাপও নয়।’ একথা বলার পর মুখে আটকে রাখা ধোঁয়া ছাড়লেন জেনারেল।

‘মহোদয় কি অনেক বছর আগে এটা কিনেছেন’, পাইপে টান দিয়ে জিজ্ঞেস করল থার্টোকাউটস্কি।

‘না, খুব বেশিদিন হয়নি। ব্রিডিং সেন্টার থেকে মাত্র দু’বছর আগে তাকে পেয়েছি আমি।’ চড়চড় শব্দে পাইপে টান দিলেন জেনারেল। কথা বলতে বলতে ধোঁয়ার মেঘে হারিয়ে গেলেন তিনি।

সেই মুহূর্তে আস্তাবল থেকে লাফ দিয়ে বেরিয়ে এল একজন সৈন্য। ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা যাচ্ছিল এবং বিশাল গোঁফওয়ালা সাদা পোশাকের আরেক সৈন্য লাগাম ধরে কিছুটা ভয়ার্ত ঘোড়াটাকে এগিয়ে আনতে লাগল।

‘এসো, এসো, আগ্রাফেনা ইভানোভনা’, এই বলে লোকটা ঘোড়াটাকে বারান্দার দিকে নিয়ে এল।

ঘোড়াটার নাম আগ্রাফেনা ইভানোভনা। দক্ষিণের সৌন্দর্যের প্রতিভূ ইভানোভনা চারপাশের লোকজন দেখে হঠাত্ যেন থমকে দাঁড়িয়ে গেল।

আত্মতুষ্টির চোখে আগ্রাফেনাকে দেখতে লাগলেন জেনারেল। কর্নেল তত্ক্ষণাত্ নিচে নেমে ঘোড়াটার গলায় চাপড় দিয়ে আদর করলেন। মেজর হাত দিয়ে পাগুলো পরখ করতে লাগলেন এবং অন্যান্য সব অফিসার তাদের মুখ দিয়ে প্রশংসার বাণী ছোটাচ্ছিলেন।

থার্টোকিউটস্কি বারান্দা থেকে নেমে ঘোড়ার পাশে অবস্থান নিলেন। ঘোড়ার লাগাম হাতে সেনাটা তেড়ে এসে অতিথির চোখে চোখ রাখল।

‘দারুণ সুন্দর সে, অসাধারণ’, থার্টোকিউটস্কি বলে চললেন, ‘দারুণ গঠনের এক পশু। আমাকে জিজ্ঞেসের অনুমতি দিলে বলি সে কি ক্ষিপ্রগতির?’

‘হ্যাঁ, তার গতি ভালোই, কিন্তু বোকার হদ্দ ওই ডাক্তারটা ওকে যেন কী খাইয়েছে, গত দু’দিন ধরে সর্দি লেগে আছে ওর।’

‘অসাধারণ এক পশু, সত্যিই সুন্দর। মহোদয়ের কি এই ঘোড়ার সঙ্গে তুলনীয় কোনো গাড়ি আছে?’

‘গাড়ি! কিন্তু ও তো মালটানার ঘোড়া না।’

‘আমি জানি তা। আসলে আমি প্রশ্ন করেছিলাম মহোদয়ের অন্যান্য ঘোড়ার সঙ্গে মানানসই কোনো গাড়ি আছে কিনা সেটা জানতে?’

‘না, আরামদায়ক গোড়ার গাড়িতে খুব বেশি অভ্যস্ত না আমি; আমি স্বীকার করছি, কিছুদিন যাবত্ আমি একটি ক্যালাশ কিনতে চেয়েছিলাম, আজকাল যেমনটা পাওয়া যায়। আমার ভাইয়ের কাছেও লিখেছি আমি, ও থাকে সেন্ট পিটার্সবার্গে। কিন্তু জানি না আদৌ সে আমার জন্য একটা পাঠাতে পারবে কি-না।’

‘আমার কাছে মনে হচ্ছে, মহামান্য জেনারেল’, কর্নেল বলে উঠলেন, ‘ভিয়েনাতে যেগুলো চলে তার চেয়ে ভালো কোনো ক্যালাশ আর হতে পারে।’

‘তুমি ঠিকই বলেছ।’ চড়চড় করে পুড়ছে তামাক।

‘আমার কাছে সেইরকম একটা ক্যালাশ আছে, মহোদয়, আসল ভিয়েনীয়।’ থার্টোকিউটস্কি বললেন।

‘যেটাতে চেপে আপনি এসেছেন?’

‘উঁহু না, এটা আমি সাধারণ কাজে ব্যবহার করি। আর ওটা একটা অসাধারণ গাড়ি। একদম পালকের মতো হালকা, আপনি ভেতরে বসলে মনে হবে নার্স আপনাকে দোলনায় দুলিয়ে দিচ্ছে।’

‘তাহলে তো সত্যিই আরামদায়ক কিছু।’

‘পরম স্বস্তি; এর কুশন, স্প্রিং, সবকিছু, সবকিছু একেবারে খাপের খাপ।’

‘আহ! সত্যিই দারুণ।’

‘আর কত যে জিনিস আপনি এটাতে বহন করতে পারবেন, আহা! আমি এরকমটা আর দেখিনি মহোদয়। যদিও আমি একটু মেরামত করছি, তবুও এখানে যা জায়গা আছে তাতে আপনি রাখতে পারবেন দশ বোতল রাম, বিশ পাউন্ড তামাক, ছয়টা ইউনিফর্ম আর দুইটা পাইপ, কল্পনাতে যতটা আসে তত বড় পাইট আর মহোদয় ভেতরে পকেট যা জায়গা আছে তাতে গোটা একটা ষাঁড় চালান করে দিতে পারবেন আর কি।’

‘হ্যাঁ, এটা বেশ ভালো।’

‘এর দাম পড়বে মহোদয় চার হাজার রুবল।’

‘এই দামে তো গাড়িটা ভালো মানের হওয়া উচিত। আপনি কি গাড়িটা নিজে কিনেছিলেন?’

‘না, মহোদয়। হঠাত্ করেই পেয়ে গিয়েছিলাম। আমার এক পুরনো বন্ধু এটা কিনেছিল। দারুণ আলাপি, আপনিও তার সঙ্গ পছন্দ করবেন। আমরা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। হরিহর আত্মা। তাস খেলায় তার কাছ থেকে জিতে নিয়েছিলাম। মহোদয় কি আগামীকাল আমার বাড়িতে সান্ধ্যভোজের দাওয়াত গ্রহণ করে আমাকে সম্মানিত করবেন? তাহলে ক্যালাশটা দেখাতে পারতাম।’

‘কী বলব বুঝছি না, আমি একাকী যেতে পারি না—যদি আমার অফিসারদের সঙ্গে করে আসার অনুমতি দেন তাহলে...।’

‘তাদেরকে নিমন্ত্রিত করার সৌভাগ্য আমায় দিন। আমার বাড়িতে যদি আপনারা আসেন তাহলে সেটা সৌভাগ্য হিসেবেই দেখব আমি।’

কর্নেল, মেজর এবং অন্যান্য অফিসাররা থার্টোকিউটস্কিকে ধন্যবাদ জানালেন।

‘আমার নিজের মত হচ্ছে মহোদয়, যে যেটা কিনতে চাই সেটা যেন ভালো হয়। যদি খারাপ হয় তাহলে এই হ্যাপা না পোহানোই ভালো। আপনি যদি আমার আতিথ্য গ্রহণ করেন তাহলে আমি আমার জমিদারির কিছু উন্নয়নকাজও দেখাতে পারি।’

জেনারেল তার দিকে তাকালেন এবং একরাশ নতুন ধোঁয়া ছেড়ে দিলেন।

থার্টোকিউটস্কি অফিসারদের আমন্ত্রণের ঘোরে ফুরফুরে বোধ করছিলেন এবং মনে মনে সব জোগাড়যন্ত্রের নির্দেশ দিচ্ছিলেন। ভদ্রলোকদের মধ্যে যারা চোখের ভাষায় ও সামান্য ঝুঁকে তার দিকে মনোযোগ দিচ্ছিলেন তাদের দিকে হাসি ছুড়ে দিলেন তিনি। তাকে খুব আশ্বস্ত মনে হলো এবং কথায় ধরা যাচ্ছিল পরম সন্তুষ্টি।

হাতে সময় থাকতেই সব আয়োজন সেরে ফেলার জন্য থার্টোকিউটস্কি তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে মনস্থ করলেন। তিনি এরইমধ্যে তার টুপি হাতে নিয়েছেন, কিন্তু অদ্ভুত এক কারণে আরো কিছুক্ষণ জেনারেলের ওখানে থেকে গেলেন। তাস খেলার টেবিল সাজানো ছিল এবং বাহিনীর সবাই চার দলে ভাগ হয়ে ঘরের চারদিকে ছড়িয়ে ছিল। ঘরে আলোর ব্যবস্থা হলো।

থার্টোকিউটস্কি জানতেন না একটু সময় এখানে বসে যাওয়া উচিত হবে কিনা। কিন্তু, অফিসাররা তাকে আমন্ত্রণ জানালে তিনি ভেবেছিলেন আমন্ত্রণ গ্রহণ করাটাই বোধকরি সৌজন্য। তিনি বসে পড়লেন। আমি ঠিক জানি না কীভাবে একগ্লাস মদ তার কনুইয়ের সঙ্গে ঠোকাঠুকি করছিল, কিন্তু কোনো ভাবনাচিন্তা ছাড়াই গিলে ফেললেন তিনি। দুই দান খেলার পর আরেক গ্লাস তাদের হাতে ঠেকেছিল যেটা একইভাবে কোনোরকম নজর না দিয়েই ঢেলে দিলেন গলায়।

‘ভদ্রমহোদয়গণ, আমাকে এখনই উঠে যেতে হবে।’

নতুন আরেক দান তাস খেলা শুরু করলেন তিনি। এদিকে, ঘরের চারপাশে যেসব কথাবার্তা চলছিল তা বিশেষ একদিকে মোড় নিল। যারা খেলছিল তাদের অনেকেই চুপচাপ ছিল, কিন্তু অন্যরা সজোরে কথা চালাচ্ছিল। এক ক্যাপ্টেন সোফায় আসন নিয়ে কুশনে এলিয়ে মুখে পাইপ ঝুলিয়ে তার দুঃসাহসিক অভিযানের শ্বাসরুদ্ধকর বর্ণনা দিয়ে অতিথিদের মনোযোগ কাড়ছিলেন। শক্তসমর্থ এক ভদ্রলোক, যার হাত দুটো ছিল বেশ ছোট, অত্যন্ত সন্তুষ্টির চোখে তার কথা শুনছিলেন আর মাঝে মাঝে তার তামাকের থলে কোটের পকেট থেকে বের করার জন্য নড়ে বসছিলেন। অশ্বারোহীদের কসরত নিয়ে আরেক কোণে আলোচনা হচ্ছিল এবং থার্টোকিউটিস্কি ইতিমধ্যে নতুন করে দু’ দান খেলে ঘরময় চলতে থাকা আলোচনার ঘোরের মধ্যে ঢুকে পড়ে কেবল নিজের জায়গা থেকে আওয়াজ দিচ্ছিলেন : ‘কোন সালে?’ বা ‘কোন রেজিমেন্টে?’ প্রায়ই যে তার প্রশ্নের কোনো উত্তর আসছে না সেদিকে খেয়াল না করেই তিনি বলে যাচ্ছিলেন। ভোজের কয়েক মিনিট আগে তাস খেলা শেষ হয়। থার্টোকিউটস্কির মনে আছে তিনি অনেক টাকা জিতেছিলেন, কিন্তু জুয়ার টাকা পকেটে ভরতে পারেননি এবং উঠে দাঁড়ানোর পর কিছুক্ষণ একই জায়গায় এমন মানুষের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছিলেন যার পকেটে কোনো রুমাল ছিল না।

তারা খেতে বসলেন। যেমনটা আশা করা যায়, মদের কোনো কমতি ছিল না এবং থার্টোকিউটস্কি অনিচ্ছাসহ তার গ্লাস ভরছিলেন, কারণ তার চারপাশে ছিল শুধু বোতল আর বোতল। দীর্ঘ এক আলোচনা চলছিল টেবিলে এবং অতিথিরা বিস্ময়করভাবে তা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এক কর্নেল, যে ১৮১২ সালে কর্মরত ছিলেন, এমন এক যুদ্ধের গল্প করছিলেন যা বাস্তবে সংঘটিত হয়নি। এবং কেউ শেষ পর্যন্ত বের করতে পারেনি কেন তিনি একটি কর্ক তুলে সুস্বাদু পাইয়ের মধ্যে গেঁথে দিয়েছিলেন। সকাল তিনটার দিকে অতিথিরা ভেগে যেতে শুরু করে। তাদের অনেককেই বগলদাবা করে তুলতে বাধ্য হয়েছিল কোচয়ানরা এবং থার্টোকিউটস্কি নিজে তার অভিজাত মর্যাদা সত্ত্বেও অশ্বারোহী বাহিনীর লোকদের কাছে এত ছোট হয়েছিলেন যে তিনি বাড়ি ফিরেছিলেন গোঁফে দুইটা হলুদ ফুলের পাপড়ি নিয়ে।

যে কোচয়ান তাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল বাড়ির সবাইকে সে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখল। কয়েক পাক দেবার পর মালিককে হলরুমের মধ্যে দিয়ে টেনে এনে শেষে এক গৃহ-পরিচালিকার হাতে তাকে সঁপে দেয়। থার্টোকিউটস্কি কোনোমতে তাকে অনুসরণ করে বাড়ির সবচে সুন্দর ঘরে তার যুবতী স্ত্রীর পাশে নিজেকে ছেড়ে দেয়। তুষারের মতো শুভ্র সাদা নাইট-গাউন পরে ঘুমিয়ে ছিলেন তার স্ত্রী। স্বামীর বিছানায় ঢলে পড়ার ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙে যায় তার—দু’দিকে হাত উঁচিয়ে ধরে চোখ খুলে তত্ক্ষণাত্ তা বন্ধ করে ফেলেন তিনি এবং তারপর বড়বড় চোখ তুলে তাকান। তার দিকে স্বামীর বিন্দুমাত্র মনোযোগ নেই দেখে পাশ ফিরে নিজের তাজা ও গোলাপি গালে হাত রেখে ফের ঘুমিয়ে পড়েন তিনি।

এ অঞ্চলের প্রথা অনুসারে ভদ্রমহিলা যখন ঘুম থেকে ওঠেন তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে। তার স্বামী বেচারা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জোরে নাক ডাকতে থাকে। মনে পড়ে ভোর চারটায় সে বাড়ি ফিরেছে। তাকে ঘুম থেকে না জাগিয়ে একাই উঠে পড়ে সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে স্বামীর পাঠানো স্যান্ডেল পায়ে গলিয়ে যখন তিনি সাদা গাউন শরীরে জড়ান তখন তাকে ফোয়ারার পানির ছটার মতো লাগছিল। তারপর তিনি সাজঘরে ঢুকে পড়েন এবং তারই মতো সতেজ স্নিগ্ধ পানিতে মুখ ধোয়ার পর টয়লেট টেবিলের দিকে এগিয়ে যান। দু’বার তিনি আয়নায় নিজেকে পরখ করেন এবং ভাবতে থাকেন, আজকের এই সকালে তাকে দারুণ দেখাচ্ছে। এই ঘটনা, অনেকের কাছে যা খুবই সাধারণ মনে হতে পারে, অন্য দিনের তুলনায় তাকে আরো দু’ঘণ্টা বেশি আয়নার সামনে কাটাতে বাধ্য করে। অনেক দেখে-শুনে সুন্দর করে সেজে তিনি বাগানের দিকে অগ্রসর হন।

আবহাওয়া ছিল অসাধারণ : গ্রীষ্মের চমত্কার দিনগুলোর একটি। সূর্য ফেলছিল তার সবচেয়ে আদরীয় রশ্মি; তবুও পল্লবিত বাগানে শীতল বাতাসের আনাগোনা ছিল এবং সূর্যের স্পর্শে ফুলগুলো ছড়াচ্ছিল মধুরতম গন্ধ। বাড়ির গৃহকর্ত্রী ভুলেই গিয়েছিলেন যে দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে এবং তার স্বামী এখনো ঘুমিয়ে আছে। ইতিমধ্যেই তার কানে ঢুকেছে দুপুরে বিস্তর খেয়ে আস্তাবলে ভাতঘুম দিতে থাকা দুই কোচয়ান ও এক ঝাড়ুদারের নাকডাকানি। তবুও তিনি বসে ছিলেন বাগানে যেখান থেকে ধু-ধু রাস্তা দেখা যায়, হঠাত্ তার চোখে পড়ে দূরে হালকা ধুলোর আলোড়ন। সেদিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পর তার চোখে পড়ে কয়েকটি গাড়ি, একটার পর একটা। প্রথমে ছিল একটা হালকা ক্যালাশ, যার দু’পাশের একদিকে ছিলেন জেনারেল আর আরেকপাশে কর্নেল। এর পিছনে ছিল চার আসনবিশিষ্ট আরেকটি গাড়ি যেখানে ছিলেন ক্যাপ্টেন, তার সহযোগী ও দুই লেফটেন্যান্ট। তার পেছনে, রেজিমেন্টের যান, এর বর্তমান মালিক হচ্ছেন মেজর এবং তারও পরে আরেকটি গাড়ি যেটাতে হাঁটুতে হাঁটু ঠেসে বসে আছে পাঁচ অফিসার আর পাদানির দখল নিয়েছে আরও তিন জন।

‘ওরা কি এখানে আসছে?’ গৃহকর্ত্রী ভাবলেন। ‘ও ঈশ্বর, হায়! তারা তো মেইন রোড থেকে নেমে পড়ছে।’

একটু যেন কেঁদে উঠলেন, হাততালি দিয়ে বাগানের ওপর দিয়ে সোজা দৌড়ে এলেন শোবার ঘরে, যেখানে তার স্বামী তখনো ঘুমুচ্ছিলেন।

‘অ্যাই ওঠ! উঠে পড়! এক্ষুনি ওঠ।’ স্বামীর হাত টানতে টানতে চিত্কার করে লাগলেন তিনি।

‘কী—কী হয়েছে?’ চোখ না খুলে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে আধঘুম স্বরে উত্তর দিলেন থার্টোকিউটস্কি।

‘ওঠ, উঠে পড়। অতিথি আসছে, তুমি কি শুনছ? অতিথি...’

‘অতিথি, কোন অতিথি?’ একথা বলে দুধ খেতে থাকা বাছুর ছানার মতো শব্দ করল সে : উ-ম-ম। আমাকে চুমু খেতে দাও।’

‘ও সোনা, ঈশ্বরের দোহাই, উঠে পড়। জেনারেল তার বাহিনীসহ আসছেন। ও ঈশ্বর, তোমার গোঁফে কী লেগে আছে?’

‘জেনারেল মহোদয়! তিনি কি চলে এসেছেন নাকি? কিন্তু, কেউ আমাকে ডেকে তুলল না কেন? আর ডিনার, ডিনার কি প্রস্তুত?

‘কিসের ডিনার?’

‘কিন্তু, আমি কি ডিনার প্রস্তুতের কথা বলিনি?’

‘ডিনার! ভোর চারটায় তুমি বাড়ি ফিরেছ এবং আমার কোনো প্রশ্নের উত্তর দাওনি তুমি। আমি তোমাকে ডাকিনি কারণ তোমার ঘুম দরকার।’

থার্টোকিউটস্কি চোখ কপালে তুলে কিছুক্ষণ তবকা মেরে থাকলেন যেন এইমাত্র বর্জ্রপাত তাকে আঘাত করেছে। মুহূর্তেই বিছানা থেকে উঠে গায়ে জামা গলালেন। কপালে হাত চাপড়াতে চাপড়াতে বললেন, ‘কতটা বোকা আমি। আমি তাদেরকে ডিনারের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। এখন কী হবে? তাদের পৌঁছাতে কি এখনো দেরি আছে?’

‘তারা যেকোনো মুহূর্তেই চলে আসবে।’

‘প্রিয়তমা, লুকিয়ে পড়। এই এখানে কে আছে? এখানে আয় বোকার হদ্দ। ভয় পাচ্ছিস কেন? অফিসাররা এখানে আসছেন। বলবি যে আমি বাড়িতে নেই, বেশ সকালে বেরিয়ে গেছি এবং আজ আর ফিরছি না। কী, বুঝেছিস? এখান থেকে যা আর সব চাকরকে নির্দেশ দে। যা, তাড়াতাড়ি যা।’

কথাগুলো বলেই তিনি দ্রুত ড্রেসিং গাউন চাপিয়ে গাড়ির গ্যারেজে লুকিয়ে পড়ার জন্য ছুটলেন, ভেবেছিলেন সেটাই হবে লুকানোর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা।

‘এটাই নিরাপদ হবে’, মনে মনে বলে কাছের গাড়িটির দিকেই পা বাড়ালেন যেটা ঘটনাক্রমে ছিল ক্যালাশ। লাফ দিয়ে ভেতরে ঢুকে তিনি দরজা বন্ধ করলেন এবং আরো সর্তকতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে চামড়ার অ্যাপ্রন দিয়ে নিজেকে ঢেকে ফেললেন। সেখানে হাঁটু গেড়ে ড্রেসিং গাউনের মধ্যে সেঁধে বসে থাকলেন তিনি।

এর মধ্যে গাড়ির বহর দাঁড়িয়েছে বাড়ির সামনের আঙিনায়। জেনারেল প্রথমে বের হলেন, কিছুটা ঝুঁকলেন, তারপর টুপির পাখনা ঠিক করতে করতে নামলেন কর্নেল। তারপর স্থূলকায় মেজর, পিছনে হালকা গড়নের লেফটেন্যন্ট, অন্যদিকে অফিসারও সার বেঁধে দাঁড়ালেন।

সিঁড়ির ওপরের ধাপে দাঁড়িয়ে এক ভৃত্য জানাল, ‘প্রভু তো বাড়িতে নেই।’

‘কী! বাড়িতে নেই; কিন্তু ডিনারের জন্য আজ কি বাড়িতে আসছে, নাকি তাও আসছে না?’

‘না, আসছেন না; তিনি সারাদিনের জন্য গেছেন এবং আগামীকাল এসময় ফিরবেন।’

‘আমাকে রক্ষা কর’, জেনারেল বলে উঠলেন।

‘ওহ, কী চরম রসিকতা’, হাসতে হাসতে বললেন কর্নেল।

‘না, না, এ রকম ঘটনা বোঝা বড় দায়’, খানিকটা রেগে গিয়ে বললেন জেনারেল। ‘যদি সে আমাদের গ্রহণ করতে না পারে তাহলে আমন্ত্রণের দরকারটা কী ছিল।’

তরুণ এক অফিসার বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি না স্যার কীভাবে এ ধরনের আচরণ সম্ভব।’

‘কী?’ জেনারেল বলে উঠলেন, যিনি সবসময় ক্যাপ্টেনের নিজের র্যাংকের কারোর মুখ থেকে দু’বার শুনতে অভ্যস্ত।

‘আমি আতঙ্কিত যে, জেনারেল মহোদয়, একজন মানুষের পক্ষে এ ধরনের কাজ কী করে সম্ভব!’

‘একদম ঠিক; যদি তেমন কিছু ঘটে থাকে তাহলে আমাদের জানানো উচিত ছিল।’

কর্নেল বললেন, ‘এখন কিছুই করার নেই, স্যার, চলুন আমরা ফিরে যাই।’

‘নিশ্চয়, কিছুই করার নেই। যা-ই হোক, তাকে ছাড়াই তো ক্যালাশটা দেখে যেতে পারি আমরা। সম্ভবত, এটা সে সঙ্গে করে নিয়ে যায়নি। এসো সবাই।’

‘মহোদয় কী চান?’

‘তোমার গৃহস্বামীর ক্যালাশটা দেখাও।’

‘অনুগ্রহ করে এদিক দিয়ে আস্তাবলের দিকে আসুন।’

জেনারেলের পিছুপিছু অন্যান্য অফিসাররা আস্তাবলে ঢুকলেন।

‘জানালাগুলো একটু তুলে দেন, জেনারেল। ভেতরটা বেশ অন্ধকার।’, বলল গৃহভৃত্য।

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, চলবে।’

জেনারেল এবং অফিসাররা ঘুরে ঘুরে ক্যালাশটা দেখতে লাগলেন, চাকা ও স্প্রিংগুলো বিশেষভাবে পরীক্ষা করতে থাকলেন।

‘অসাধারণ কিছু না মোটেই’, বললেন জেনারেল; ‘খুবই সাধারণ এটা।’

‘মোটেই চেয়ে দেখার মতো কিছু না’, কর্নেল যোগ করলেন; ‘ভালো কোনো জিনিসও নেই এটাতে।’

‘আমার কাছে মনে হচ্ছে, জেনারেল, চার হাজার রুবলের উপযোগী নয় এটা।’

‘কী?’

‘আমি বলেছি, জেনারেল, আমি মনে করি না এর দাম হতে পারে চার হাজার রুবল।’

‘চার হাজার! দু হাজারও না। সম্ভবত, ভেতরটা ভালোভাবে গোছানো। এই বলে অ্যাপ্রনটা টান দিলেন।’

এবং থার্টোকিউটস্কি অফিসারদের চোখের সামনে আবির্ভূত হলেন, ড্রেসিং গাউনের ভেতরে এবং হাঁটু মোড়া অবস্থায়।’

‘কী খবর, আপনি এখানে!’, বিস্ময়ে ভুরু কুঁচকে জেনারেল বললেন।

তারপর তিনি থার্টোকিউটস্কিকে অ্যাপ্রন দিয়ে পুনরায় ঢেকে দিলেন এবং বাহিনীসহ প্রস্থান করলেন।

 

*ক্যালাশ : ঘোড়াটানা আরামদায়ক গাড়ি