কবির মুখ দিয়ে বেরুল চারটি শব্দ—জল পড়ে, পাতা নড়ে। কোনো কোনো বিহ্বলতার ভেতর দিয়ে এই ক’টি শব্দ বেরিয়ে প্রমাণ করল, কবিকে যে কবি হিসেবেই জন্মাতে হয়। কবি আসলে একটি বোধ নিয়ে জন্মায় বা আলাদা একটি চোখ নিয়ে। ফলে যেখানে অন্য একজন মানুষ দুপুর মানে দিনের মধ্যাহ্ন, সেখানে কবি উপমার ভেতর দিয়ে, অনুপ্রাসের দোলায়, চিত্রকল্পের চমকে একটি দুপুর আবিষ্কার করে পাঠকের সামনে হাজির করে। ফলে ছোট্ট বরীন্দ্রনাথের অবচেতনে বেরিয়ে আসা, ‘জল পড়ে, পাতা নড়ে’ আমাদের উপলব্ধিকে নাড়িয়ে দেয়।
‘শিমুলের নিশ্চিহ্ন ভূমি থেকে/সাঁকো চলে গেছে—/মধুমতি বেয়ে ওপাড়ে।’ এটি ‘ভালোবাসার অনুভূতি’ শিরোনামে কবিতার প্রথম তিনটি পঙিক্ত। এই কবিতার কবি পারভীন রেজা। শুধু তিনটি লাইন পড়ে একটা নস্টালজিয়া টের পাওয়া যায়। আমাদের টেনে নিয়ে যায় আবহমান বাংলার এক সবুজ উদ্যানে। যেখানে আমরা মুগ্ধ হয়ে, অপার হয়ে তাকিয়ে থাকি দিগদিগন্তে। আরেকটি কবিতা, এর শিরোনাম ‘আসবাব সম’। কবিতার শিরোনামে চমক আছে। আর কবিতার শুরু এরকম, ‘একদিন খুঁজতে গিয়ে/প্রেম গেছে হারিয়ে/দেখি অবশেষে।/মৌনতার আঘাতে হারালো যা/তাকে খুঁজে আর কি/যাবে পাওয়া/অবহেলায় ঝরে—/ভেঙে গেছে প্রেম/সব ভুলে গেছি।’ কবিমাত্রই একটি চাতকহূদয়, প্রেমহূদয়, তা পাঠকমাত্রই জানা। তবে এ প্রেম যে শুধুমাত্র মানবিক, তা নয়। এ প্রেম প্রকৃতি, ফুলপাখি, নিসর্গ, সবকিছু ঘিরে। অভাবনীয় এই পৃথিবীর প্রতি যে মানুষের যুগ যুগ ধরে মুগ্ধতা, সেই মানবহূদয়ের ভাষা কবির কলম দিয়ে বেরিয়ে আসে প্রায়শ।
‘নোনাজল’ কাব্যগ্রন্থের মাত্র দুটি কবিতার কয়েকটি পঙিক্ত এখানে উল্লেখ করা হলো। বইয়ে কবিতা রয়েছে একশ’র ওপরে। এই শত কবিতা সংখ্যার হিসেবে শুধু নয়, বিচিত্রতার হিসেবেও। নানারকম অনুভূতি এসব কবিতায় উঠে এসেছে। প্রেম, প্রকৃতি, উদ্বাস্তু মানুষের হাহাকার, স্বপ্ন, বিষণ্নতা, কবিতার প্রাত্যাহিকতা, ফেলে আসা সবুজ মাঠ, এমন আরো কত কী? কবিকে, কবির অনুভূতির এই বহুবিদ পথ ধরে হাঁটতে চাইলে আসলে পুরো কাব্যগ্রন্থকেই পাঠ করতে হবে। আশা করি এই পাঠের আকর্ষণশক্তি এই কাব্যগ্রন্থে আছে।
নোনাজল
পারভীন রেজা
প্রচ্ছদ : মোস্তাফিজ কারিগর
প্রকাশক : আপন প্রকাশ
প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০১৮
দাম : ২৫০ টাকা