একটি বড়ো পতাকা

মনজুরুল হাসান

আসছে ২০ নভেম্বর, শনিবার পবিত্র ঈদুল ফিতর। যুদ্ধের বছরে ঈদ। আব্দুল হাই খলিফা ঈদের কাপড় বানানো নিয়ে ব্যস্ত। বাজারের কোণে তার ছোট্ট দোকানের ভেতর থেকে সেলাই মেশিনের শব্দ পাওয়া যায়। কমান্ডার তারেকের অনুরোধ—ঈদের আগেই বড়ো একটি পতাকা বানিয়ে দিতে হবে। বয়স্ক দর্জি একটু ইতস্তত হেসে সেলাই করা খদ্দর কাপড়ের সুতা কাটতে কাটতে বলেন, দিব দিব। অবশ্যই বানিয়ে দিব।

এগারো দিন হলো। একদল মুক্তিযোদ্ধা উঠেছে গ্রামের হাই স্কুলের ভবনে। নরসিংদীর রায়পুরা এলাকায় অপারেশনে যাবার আগে বিন্নাবাইদ গ্রামে তাদের এই যাত্রাবিরতি।

আজ ১৮ নভেম্বর। আগামী ২০ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার ঈদের দিন সকালে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার তারেক বিন্নাবাইদ হাইস্কুলের মাঠে একটি বড়ো আকারের স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়াবার পরিকল্পনা করছেন। 

গতকাল কিশোরগঞ্জ এলাকার কটিয়াদী বাজারের বেইস ক্যাম্প থেকে গ্রামটিতে এসে যোগ দিয়েছে আরো দুজন মুক্তিযোদ্ধা। নরসিংদীর মনোহরদীর উত্তর প্রান্তের শেষ গ্রাম বিন্নাবাইদ। একদল মুক্তিযোদ্ধার উপস্থিতি গ্রামের মানুষদের আসন্ন ঈদ উত্সব-আনন্দকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

বিন্নাবাইদ হাই স্কুলের মধ্যবয়সী ধর্ম শিক্ষক বারেক স্যার পাঞ্জাবি বানানোর জন্য আব্দুল হাইকে সাড়ে তিন গজ সবুজ রঙের কাপড় দিয়ে কোথায় যেন উধাও হলেন। কিছুদিন আগেও তিনি একবার উধাও হয়েছিলেন। কেউ কেউ বলছেন, তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে ভারতের আগরতলায় চলে গেছেন।

আব্দুল হাই খলিফার কাঠের আলমারির তাকে নানান রকম কাপড়ের টুকরো। সেখানে মিশে আছে অনেক লাল লাল রঙের কাপড়ের টুকরো। বেশির ভাগ স্কুলের মেয়েদের লাল জামা ও পাজামার বেঁচে যাওয়া কাপড়ের টুকরো। কিছু লেপ-তোষকের লালসালুর কাপড়। জমেছে নতুন খদ্দর কাপড়ের টুকরো। সবুজ সিল্ক কাপড়ের টুকরোও আছে কিছু। কিন্তু সেটি দিয়ে বড়ো একটি পতাকা বানানো সম্ভব নয়। পতাকার লাল বৃত্তের মাঝে হলুদ মানচিত্রটি বানানোর জন্য দক্ষ দর্জি তার কিশোরী নাতনির মাথার হলুদ লেস-ফিতাটি ব্যবহার করবেন। সবুজ থান কাপড়ের জন্য ভাবা হয়েছে একটি সবুজ লুঙ্গি। সেলাই বিহীন সেই আয়তকার সবুজ লুঙ্গিটি ব্যবহার করা হবে পতাকার জমিনের জন্য। তারেক কমান্ডার নরসিংদীর বাবুরহাট থেকে একটি সবুজ লুঙ্গি আনার ব্যবস্থা করেছেন।

দুপুরে তাদের গুপ্তচর-পত্রবাহক মজিবর বাবুরহাট থেকে খালি হাতে ফিরে এল। মজিবর জানাল—বাবুরহাটের অনেক হিন্দু তাঁতিদের বাড়িঘর, দোকানপাট পাকিস্তানি মিলিটারি আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। শুধু কয়েকটি গামছার দোকান খোলা ছিল। সেখানে কোনো লুঙ্গি নেই।

আব্দুল হাই খলিফা বিষণ্ন মনে তার দোকানের আলমারি খুলে বারেক স্যারের রেখে যাওয়া পাঞ্জাবির সবুজ কাপড়খানি একবার নেড়েচেড়ে দেখলেন। পতাকার জন্য তাকে যে করে হোক একটি ব্যবস্থা করতেই হবে। একজন মুক্তিযোদ্ধা প্রধানের আবদার। জন্মভূমির মাটিতে স্বাধীনবাংলার পতাকা উড়াতে চান। কোথায় গেলেন, তাদের হাইস্কুলের বারেক মৌলবি মাস্টার?

সন্ধ্যার পূর্বক্ষণে একজন অপরিচিত পত্রবাহক যুবক দূর থেকে দুঃসংবাদ নিয়ে এল। যুদ্ধক্ষেত্রে বারেক স্যার শহিদ হয়েছেন। ভারতের আগরতলার মেলাঘরের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প থেকে এসেছে এই যুবক। বারেক স্যার অনেক আগেই আগরতলার প্রশিক্ষণ ক্যাম্প থেকে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিংপ্রাপ্ত। সেক্টর কমান্ডারের নির্দেশে তিনি তার স্থানীয় দল নিয়ে যাচ্ছিলেন মেলাঘরের উদ্দেশে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্তপথের একটি খণ্ডযুদ্ধে তিনি আহত হন। দুই দিন পর মেলাঘর ক্যাম্পে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে তিনি একটি পত্র বিন্নাবাইদ নিবাসী আব্দুল হাই খলিফার উদ্দেশে লিখে যান। বারেক স্যারের সেই প্রেরিত পত্র অশ্রুসিক্ত চোখে পাঠ করে শোনান কমান্ডার তারেক। একজন যোদ্ধা তার সহযোদ্ধার আকুতি পাঠ করে শোনান। পত্রের শেষে শহিদ মুক্তিযোদ্ধা বারেক স্যারের শেষ অনুরোধ ছিল—তার পাঞ্জাবির সবুজ কাপড়টুকু যেন একটি পতাকা বানানোর জন্য ব্যবহার করা হয়।