জোবায়ের মিলন
পঞ্চাশের দশকে যে ক’জন সাহসী তরুণ কবি প্রচল পথ ভেঙে নতুন কাব্যধারা খোঁজার চেষ্টায় নিজস্ব ভাব-ভাষা-ভঙ্গি নিয়ে প্রকাশ শুরু করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তও একজন। এর মধ্যেও সবার সাথে থেকে, সবার থেকে ভিন্ন বর্ণে ভিন্ন ক্যানভাস তৈরিতে তিনি ছিলেন মনোযোগী।
স্রোতকে অনেক সময়ই অনেকে বদলে দিতে চান অত্মপ্রচার, প্রকাশ ও অহমের জোরে। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত সে ফাঁদে পা না দিয়ে নিষ্ঠ মননে তরি ভাসিয়েছেন কবিতার অমল প্রেমের আহ্বানে। কবিতার নির্মাণপথ যে এক, অদ্বিতীয় ও অনশ্বর নয়, তা প্রমাণে নিমগ্ন হয়েছেন একাগ্রচিত্তে। কবি শঙ্খ ঘোষের সাক্ষ্যে জানা যায়, ১৯৫৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট হলে আয়োজিত ঐতিহাসিক কবিসম্মেলনে জীবনানন্দসহ বাহাত্তর জন প্রবীণ-নবীন কবির মধ্যে অলোকরঞ্জনের ‘আমার ঠাকুমা’ কবিতাটি উপস্থিত সকলের প্রবল আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
অভিন্নতাকে ভিন্নতায় আঁকা এই কবির প্রথম কবিতার বই ‘যৌবনবাউল’ (১৯৫৯)। পরিসংখ্যানগতভাবে ‘যৌবনবাউল’ প্রথম বই হলেও এর আগে কবি অলোকরঞ্জন কবিবন্ধু আলোক সরকারের সাথে যৌথভাবে তাঁর অনুবাদে প্রকাশ করেন ভালেরি-মালার্মে-ভেরলেন-বোদলেয়ার প্রমুখ কবির ফরাসি গীতিকবিতার সংকলনগ্রন্থ ‘ভিনদেশী ফুল’। সেই সময়ে সহযাত্রী শক্তি-শঙ্খ-সুনীল-বিনয়-উত্পলকুমার ও অগ্রজ কবিরা তাঁকে দেখেছেন ‘বাংলা কবিতার যুবরাজ’ রূপে। পঞ্চাশের আগে অতিরঞ্জিত স্লোগানধর্মী কবিতা বা একেবারে বিপরীত ধারার যৌনতাক্রান্ত কবিতার গ্রাস থেকে বাংলা কবিতার আত্মচিহ্নিত শুভ্রস্বরকে উঁচিয়ে রাখার প্রতিজ্ঞায়, কবিতা ও চর্চাকে ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকারে প্রকাশিত ‘শতভিষা’ ও ‘কৃত্তিবাস’ কবিতাপত্রিকায় অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের উপস্থিতি ছিল নিয়মিত।
‘এখন যুদ্ধ না শান্তি স্পষ্ট করে বুঝতেই পারি না/ ভেবেছি পুণ্যাহে ঝিঁঝি স্বর্গতেরা একত্র হয়তো হয়েছে;/ বিলাচ্ছে করুণা আর অভিজ্ঞতার শুধু সুনির্বাচিত সমাচার সূর্যান্তিকে/ কিন্তু যেই একটি রশ্মির খুব কাছে ঘেঁষে দাঁড়িয়েছি/ দেখি গোধূলির নিলাম করেছে ওরা... / হেমন্ত না শীত কিছুই বুঝা যায় না:/ আকাশের কালো গহ্বরে হঠাত্ দেখি দু-ঋতুর দ্বৈরথ/ কেমন সুন্দর অথচ খুব অবান্তর... শীত ও ফাল্গুনী/... যুদ্ধ ঠিক শেষ হয়নি, অথবা এখন শান্তি শেষ।’ (এখন শান্তি ও যুদ্ধ)। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতা উত্তরসমালীন বাংলা কবিতার তো বটেই, আবহমান বাংলা কবিতার রেখায়ও এক উজ্জ্বল উত্তরাধিকার। তাঁর সুচিন্তিত কবিতা বাংলা মাতৃভাষার সীমানাকে সম্প্রসারিত করেছে অনায়াসে। আন্তর্জাতিক অধ্যাপক, বিশ্বসাহিত্যের বরেণ্য গবেষক, বাংলা ভাষায় ব্রেশট্-হাইন-গোয়েট, রিলকের অনুবাদক এই কবির মৌলিক কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা চুয়াল্লিশটি। ‘যৌবনবাউল’ থেকে ‘শুকতারার আলোয় পড়ি বিপর্যয়ের চিঠি’ (২০১৮) পর্যন্ত তাঁর প্রতিটি কবিতায় কাব্যসুতার মিহিন সেলাই জারি আছে। পরের কবিতাও সে সেলাই দাগ হারিয়ে ট্রামলাইন থেকে একটুও সরেনি বার্ধক্যের দ্বন্দ্ব-দুর্বল্যে।
একটি কাল সূচনার শুরুর দিকের কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতা আগাগোড়ায় পড়তে গেলে সূর্যমুখী এক কবিকে পাওয়া যায়। পেশাগত অধ্যাপনার কারণে ভারত মাটি থেকে জার্মান মাটিতে থিতু হলেও তিনি দুই প্রান্তের কবিতাকে বাঁধতে চেয়েছেন এক কবিতার উচ্চকিত বন্ধনে। বি-ভাষাকে মমতায় পুষে যেমন বাংলায় দেখিয়েছেন সে রূপ, বাংলাকে ভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে কবিতাকেই তুলে ধরেছেন বিশ্বসাহিত্যের ভিন্ন অঙ্গনে। কবিতার পয়ারে, পর্বে তার চিহ্নিত ছবির ছাপ গাঢ় : ‘লুপ্ত হয়ে যায় শরীর, আমি আজ বিশ্বকল্যাণে/ তোমার চুম্বন করেছি প্রার্থনা/ মশাল জ্বেলে কারা এখুনি ছুটে গেল?/ মৌলবাদী ওরা, বলেই একজন সে-দলে ভিড়ে গিয়ে/ আমার উদ্দেশ্যে দেখাল তর্জনী/ এত সহজ আজ দৃষ্টিকোণগুলি!/ নিপুণ অনায়াসে বদল করে নেওয়া!/ দলে না গিয়ে তবু তোমার চুম্বন দাবি করেছি বলে/ ছোরা শানিয়ে ওরা আমায় ঘিরে আসে।’ (মৌলবাদী নই)।
‘আমি তো এক শখের নিছক শব্দব্যবসায়ী/ আনন্দের ক্লান্তি আনে আমার চোখে ঘুম’। কবি না ঘুমিয়েছেন, কবি না শখের নিছক শব্দব্যবসায়ী। তাঁর সরল এই ভাবাবেগের ভেতরই নিষ্ঠায় দায়বদ্ধ কবির চোখ ভেসে উঠেছে ভাষার, বাঁকের বুননশৈলীর অভ্যন্তরে। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতার এমন নরম সারল্যে একবার ঢুকে গেলে বের হতে ইচ্ছা করে না আর। পাঠের পর পাঠ করলেও ক্লান্তি আসে না।
অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত [৬ অক্টোবর ১৯৩৩—১৭ নভেম্বর ২০২০]