আনোয়ার হোসাইন, আদমদীঘি (বগুড়া) সংবাদদাতা
রনি ও হোসেন (ছদ্মনাম) ৯ বছর বয়সি দুই বন্ধুর পরিচয় বগুড়ার আদমদীঘির সান্তাহার জংশন স্টেশনে। রনি থাকে মায়ের সঙ্গে প্ল্যাটফরমে। হোসেন কখনো তার বাবা-মায়ের সঙ্গে বস্তিতে আবার কখনো রাত কাটায় ওভারব্রিজে। তাদের দুই জনের বাবা-মা ট্রেনে ভিক্ষা করেন।
মঙ্গলবার রাতে রেলওয়ের ফুটওভারব্রিজের এক কোণে তাদেরকে ‘ডান্ডি’ সেবন করতে দেখা যায়। ডান্ডি হলো এক ধরনের আঠা। মাদকসেবীরা ডান্ডি নামের এই আঠা প্রথমে পলিথিনের ভেতর ঢোকায়। এরপর পলিথিন থেকে মুখ ও নাকের মধ্য দিয়ে ভেতরে টেনে নেয়। তারা জানায়, সারা দিন ভিক্ষার যে টাকা হয় তা দিয়ে ক্ষুধার জ্বালা মেটাতে রুটি বা ভাত কিনে খায়। এরপর বাকি যে টাকা থাকে তা দিয়ে লুডু খেলে ও ডান্ডি কিনে সেবন করে। প্রতিদিন তারা দুটি করে আঠার কৌটা কিনে।
মানসিক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডান্ডি নামে প্রচলিত এই আঠায় অ্যারোমেটিক কম্পাউন্ড থাকে। মূলত, জংশন স্টেশন এলাকার ছিন্নমূল শিশুরা ডান্ডি নামের এই মাদক সেবন করছে। এতে এসব শিশুর মস্তিষ্কের নানা বৈকল্য হয়।
গত কয়েক দিন স্টেশন ঘুরে আরো দেখা যায়, রনি ও হোসেনের মতো আরো অনেক শিশু ডান্ডি নামের মাদক সেবনে আসক্ত হয়ে পড়েছে। ডান্ডি সেবন করে এমন কয়েক জন শিশুর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, প্রায় সবাই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। ভিক্ষাবৃত্তির পাশাপাশি বোতলসহ রাস্তায় পড়ে থাকা পরিত্যক্ত জিনিসপত্র সংগ্রহ করে তা ভাঙারি দোকানে বিক্রি করে। এসব শিশুরা সহজেই আঠার কৌটা সংগ্রহ করছে স্থানীয় হার্ডওয়্যার দোকানগুলো থেকে। স্থানীয় বাসিন্দা এস এম জিল্লুর রহমান জানান, এখানে যেসব মাদকসেবী শিশু রয়েছে তাদের পুনর্বাসন ও চিকিত্সার কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। স্টেশনে অনেক শিশুই ডান্ডি নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েছে তা প্রায় সকলেরই জানা।
সান্তাহার রেলওয়ে থানার উপ-পরিদর্শক মোস্তফা কামাল জানান, স্টেশন এলাকায় এসব শিশুরা যেন অপকর্ম বা মাদক গ্রহণ করতে না পারে সেদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক নজর রাখা হয়েছে। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা শরিফ উদ্দীন জানান, যেসব পথশিশুর বাবা নেই অথবা বাবা-মা দুই জনই নেই এমন শিশুদের সরকারি শিশুকেন্দ্রে রেখে লালনপালন করা সম্ভব। সেখানে ২৪ বছর বয়স পর্যন্ত তাদের রাখা যায়। সান্তাহার স্টেশনের যেসব পথশিশু অভিভাবকহীন তাদের তালিকা করে সরকারি শিশুকেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। ফলে তারা আরো ১০টি স্বাভাবিক শিশুর মতো বেড়ে ওঠার সুযোগ পাবে।