মোজাম্মেল হক নিয়োগী
কয়েক দিন ধরেই দারাইস সাপের মতো ফুঁসতে থাকে বাদল ভুঁঞা। এমএ পাস করে কয়েক বছর চেষ্টাচরিত্র করে ব্যর্থ হয়ে স্থানীয় বাজারে শিশুদের জামাকাপড়ের একটা দোকান দিয়ে বসেছে। টুকটাক বেচাকেনা হয়। তবে ব্যবসার চেয়ে ফেসবুকেই মনোযোগ বেশি। অনেক সময় খরিদদারের সঙ্গে কথা না বলে হাসির স্ট্যাটাস দেখে খিকখিক করে হাসে। কমেন্ট করে। খরিদদার বিরক্ত হয়ে অন্য দোকানে চলে যায়। তাতে তার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই।
বাদল ভুঁঞা স্ট্যাটাস দিয়ে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে থাকে কয়টি লাইক কমেন্ট পড়ে তা দেখার জন্য। সারা দিনে দু-একটা লাইক পড়ে; কমেন্টের বালাই নেই। রাতে ভীষণ মনক্ষুণ্ন হয়। আক্ষেপ আর ক্ষোভে মাথার ভেতরে কী যেন কামড়াতে থাকে। এত ভালো স্ট্যাটাস দিয়েও কোনো লাইক পাই না—মূর্খ মানুষ আমার স্ট্যাটাস বোঝে না। না-হয় হিংসা।
পাশের গ্রামের নিয়ামত আলীও ফেসবুকের পোকা। তার স্ট্যাটাসে ষাট-সত্তরটি লাইক পড়ে। কিছু কমেন্টও পড়ে। সে গর্বিত।
বাদল ভুঁঞা শুধু আক্ষেপ করেই ক্ষান্ত হয় না। দোকানে বসে নানা জনের কাছে অভিযোগও করে। নিয়ামইত্যা একটা মূর্খ, হেও লাইক কমেন্ট পায় আর আমি পাই না। দেশের মানুষ এক মূর্খ!
এসব কথা তো আর পেটে রাখার মতো নয়। দু-একজন নিয়ামতের কানে সযত্নে পৌঁছে দেয়। একদিন নিয়ামত বাইক চালিয়ে এসে বাদলের দোকানে বসে। প্রথমে খোশমেজাজে ব্যবসার খোঁজখবর নেয় অতীব ঠান্ডা মাথায়। একই এলাকার পরিচিত মানুষ, খোঁজখবর নিতেই পারে। তাতে সমস্যা নেই। তারপর ধীরে ধীরে ফেসবুকের কথা তোলে। ফেসবুকের কথা তুলতেই পারে, তাতেও সমস্যা নেই। তাহলে সমস্যা কোথায়? সেটিই বলছি।
নিয়ামত হোসেন বাদলের দু-তিন বছরের ছোট বলে ‘আপনি’ করে এবং বাদল ‘তুমি’ করে সম্বোধন করে। নিয়ামত বলল, বাদল ভাই, স্ট্যাটাসে কেমন লাইক পড়ে?
বাদল ক্ষোভের সঙ্গে বলল, ফেসবুক অইলো আজাইর্যা আর মূর্খ মানুষের লাইগ্যা। এরা স্ট্যাটাসের মর্ম বুঝে?
—তাইলে যারা ফেসবুক চালায় হেরা ব্যাহই মূর্খ।
—শুধু মূর্খ না, ফাজিলও।
এভাবে এক কথায় দুই কথায় তাদের মধ্যে প্রথমে শুরু হয় বাকযুদ্ধ। বাকযুদ্ধের এক পর্যায়ে নিয়ামতকে মূর্খ ও ‘এমপি-র চাইমচ্যা’ ডাকার কারণে ক্রমান্বয়ে সেটি মল্লযুদ্ধে রূপ নেয়। কিন্তু তাতেও সমস্যা ছিল না। বড় সমস্যা সৃষ্টি হলো অন্য জায়গায়।
বাদল আর নিয়ামতের মল্লযুদ্ধের খবর ক্রমে বাজারে ছড়িয়ে পড়ে এবং বাজারের লোকজন দুই দলে ভাগ হয়ে মারামারিতে লিপ্ত হয়। এই মারামারি চলে প্রায় ঘণ্টাখানেক। তারপর স্থানীয় মুরুব্বিরা এসে মারামারি থামায়। কিন্তু ততক্ষণে বাদল ও নিয়ামতসহ দশ-বারোজনকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। ভর্তি হয়েছে দুটি কারণে, একটি হলো চিকিত্সা এবং দ্বিতীয়টি হলো পরবর্তী সময়ে মামলা করার জন্য প্রমাণ।
হাসপাতালে বাদল ভুঁঞা আর নিয়ামতের ভাগে পড়ে পাশাপাশি সিট। দুজন দুদিকে ফিরে শুয়ে আছে। ডাক্তাররা ঘটনার মূল কারণ জেনে মুখ টিপে হাসাহাসি করেন আর চিকিত্সা দেন।
নিয়ামত ও বাদল দুজনেই মাথার ব্যান্ডেজসহ সেলফি তোলে। ফেসবুকে পোস্ট দেয়। এবারও নিয়ামতের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ে পড়ে। এক শ ছিয়াশিটি রিঅ্যাকশন। বাদলের ভাগে জোটে মাত্র বারোটি।
রাগে-ক্ষোভে ফেসবুকের আইডি ডিলিট করে দিয়ে বাদল ছাদের দিকে নিশ্চল চোখে তাকিয়ে থেকে মনে মনে বলে, আহ্! শান্তি।