নদীদূষণে ইটিপি ব্যবহার

জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্পর্কে আমরা বহুবার আলোচনা করেছি। বিষয়গুলো সম্পর্কে খবরের কাগজে বিশদ ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে ইতিপূর্বে। কেউ কেউ বুঝলেও অধিকাংশ মানুষেরই ধারণা নেই এই তিন বিষয় সম্পর্কে। তেমনি ধারণা নেই ইটিপি সম্পর্কেও। ইটিপি হচ্ছে ‘ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট’। অর্থাত্ ‘তরল বর্জ্য শোধনাগার’। আরেকটু পরিষ্কার করে বললে ‘পানি শোধনাগার’। পানিতে মিশে থাকা অবাঞ্ছিত উপাদানসমূহকে দূরীকরণের মাধ্যমে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা হয় এ প্ল্যান্টে। শুধু তা-ই নয়, ইটিপির মাধ্যমে নদী কিংবা জলাশয়ের পানিদূষণ রোধ করা যেমন  সম্ভব, তেমনি বিশুদ্ধ পানিও পাওয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে ইটিপি স্থাপন করতে হবে নদী বা খালের মোহনাতে। অর্থাত্ যে স্থান দিয়ে শিল্পকারখানায় ব্যবহূত দূষিত বর্জ্য পানি নদী বা খালে প্রবেশ করবে, ঠিক সেই স্থানে এই প্ল্যান্ট স্থাপন করতে হবে।

আমাদের দেশে বিভিন্নভাবেই জলাশয় দূষণ হচ্ছে। তার মধ্যে নদী-খাল দূষণের জন্য খুব বেশি দায়ী হচ্ছে শিল্পকারখানায় ব্যবহূত বর্জ্য পানি। বিশেষ করে কারখানার বর্জ্য পানি সরাসরি নদীতে ফেলতে দেখছি আমরা। যে পানিতে থাকে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ, জৈব সংক্রামক পদার্থ ও ক্ষতিকর গ্যাসীয় পদার্থ। যার ফলে নদী-খালের পানি বিষাক্ত হয়ে যেমন রং পরিবর্তন হচ্ছে, তেমনি জলজ উদ্ভিদসহ মাছ-পোকামাকড় বাসস্থান হারাচ্ছে। এছাড়াও এ পানি ব্যবহারে মানুষ মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। বিশেষ করে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে মৃত্যুবরণও করছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা ২০০৭ সালে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, অনিরাপদ পানি সরবরাহের কারণে প্রতিবছর বিশ্বে ৪ বিলিয়ন মানুষ ডায়রিয়া রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এবং ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। প্রতিবেদনটি আমাদের জন্য বিশেষ একটি অশনিসংকেত, যা নিয়ে আমাদের এখুনি ভাবা উচিত, তাতে ইটিপির প্রয়োজনীয়তা আমাদের মধ্যে দেখা দেবে বলে বোধ করছি।

আমরা দেখেছি বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন জলবায়ু নিয়ে বেশ সোচ্চার। আমাদের দেশীয় সংগঠনগুলোও পিছিয়ে নেই। তারা জলবায়ু পরিবর্তন রোধের পাশাপাশি ইটিপির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কেও জোরালো বক্তব্য রাখছে। সম্প্রতি দেশের পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো ইটিপির ওপর খুব জোর দিচ্ছে। বিশ্ব নদী দিবস উপলক্ষ্যে তারা ইটিপির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছিল। নদীদূষণ রোধে কিছু প্রস্তাবনাও রেখেছিল তারা। তাদের প্রস্তাবনাসমূহ আমাদের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন রোধে সেই প্রস্তাবনার ভূমিকা অপরিহার্য মনে করছি আমরা। প্রস্তাবনাগুলো নিম্নে তুলে ধরছি আমরা।

নদীদূষণ রোধে

n প্রত্যেক কারখানায় ইটিপি ফরমুলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে।  n কঠিন বর্জ্য পদার্থ পানিতে মিশতে দেওয়ার পথ বন্ধ করতে হবে। n মানববর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদাভাবে ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করতে হবে। n যে যতটুকু দূষণ করছে, তাকে সেই অনুযায়ী জরিমানার বিধান করতে হবে। এ ছাড়াও সরকারি দপ্তরের কেউ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। n নদীদূষণ রোধে জলাশয়ের উত্সমুখে বাঁধ দেওয়াসহ জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। n সড়ক সম্প্রসারণের প্রয়োজনে ইচ্ছামতো বাঁধ দিয়ে খালের ওপর সড়ক নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। বন্ধ হওয়া খালগুলোকে সংস্কার করে স্বাভাবিক পর্যায়ে আনতে হবে। n নদীর পানি ব্যবহার উপযোগী করার জন্য ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করতে হবে। n রাজধানীর হারিয়ে যাওয়া খালগুলোকে পুনরুদ্ধার করতে হবে। n মৌসুমে যমুনা নদী থেকে নদী-খালে পানি আসে কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে জোয়ার-ভাটার কারণে পানির পরিমাণ হ্রাস পায়; সেক্ষেত্রে পানি আনার উত্স নিয়ে ভাবতে হবে। n আইন সংশোধন করে কমিশনকে শক্তিশালী করতে হবে; নদী আদালত গঠন করতে হবে। n নদীদূষণ ও নদী রক্ষায় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সম্পৃক্ত করতে হবে। n নদীগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে, তাই ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে গভীরভাবে নদী খনন করতে হবে।

উপরিউক্ত প্রস্তাবনাসমূহ মেনে চলতে পারলে আমাদের হারিয়ে যাওয়া জলাশয় উদ্ধারের পাশাপাশি জলাশয়দূষণ কমে আসবে। এক্ষেত্রে শিল্পকারখানার মালিকদের ইটিপি ব্যবহারে বাধ্য করলেই হবে না; যেহেতু এটি ব্যয়বহুল প্রকল্প, সেক্ষেত্রে সহজ ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থাও করতে হবে। তাতে শিল্পকারখানার মালিক উদ্বুদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি প্ল্যান্ট ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠবেন। তাহলে হয়তো আমরা দেশে দূষণমুক্ত জলাশয় দেখতে পাব।

n লেখক :পরিবেশবিদ