আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ যুবায়ের
বরাবরই দেশে বেকারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। করোনার কারণে সে সংখ্যা আরো বেড়েছে। বেকার তরুণ-তরুণীদের এমনিতেই মাথা নিচু করে চলতে হয়। সহ্য করতে হয় পরিবার ও সমাজের নানান কটু কথা। অর্থকষ্ট তো আছেই। এত এত যন্ত্রণার সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে কিছু জ্ঞানপাপীর দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ ও প্রতারকদের প্রতারণা। বেকারদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে নানানভাবে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়ে চলেছে কিছু বিবেকহীন শিক্ষিত মানুষ।
একজন ফেসবুকে ভ্যাকেন্সি খোঁজার একটি গ্রুপে তাঁর প্রতিষ্ঠানে ‘সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট ইন্টার্ন’ নেওয়ার জন্য সার্কুলার দিয়েছিলেন অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে। তাঁর প্রদত্ত নিয়ম মেনেই সিভি পাঠালাম। ২৫ অক্টোবর ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাকা হলো। বনানীর ৪ নম্বর রোডে অবস্থিত অফিসে ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য গেলাম। পহেলা নভেম্বর জানানো হলো, আমি নির্বাচিত হয়েছি। আমাকে কয়েক দিনের মধ্যেই অ্যাপোয়েন্টমেন্ট লেটার দেওয়া হবে। নভেম্বর পেরিয়ে ডিসেম্বর মাস চলছে, কিন্তু অ্যাপোয়েন্টমেন্ট লেটার আর দেওয়া হচ্ছে না। তিনবার ইমেইল দিয়েও পাইনি উত্তর। চাকরিদাতাকে আবার ফোন দেওয়া নিষেধ, ফোন দিলে তিনি খুব বিরক্ত হন!
তেজগাঁও বাণিজ্যিক এলাকায় একটি ই-কমার্স সাইটে ‘কাস্টমার রিলেশনশিপ অফিসার’ পদে ২৬ নভেম্বর ইন্টারভিউ দিয়ে এলাম। ইন্টারভিউগ্রহীতা বললেন যে, দুই সপ্তাহের একটি ট্রেনিং করতে হবে, ট্রেনিং সফলভাবে করতে পারলে চাকরি নিশ্চিত। জানতে চাইলাম ট্রেনিং কবে শুরু হবে এবং আমাকে কবে জানানো হবে? তিনি বললেন, আগামী সপ্তাহে আপনাকে জানানো হবে এবং ট্রেনিং শুরু হবে। আগামী সপ্তাহ পেরিয়ে আগামী মাস চলে এলো, কিন্তু আমি আর কিছু জানলাম না!
ফেসবুকে একজন পোস্ট দিয়েছেন—‘যারা বেকারত্বের কষ্টে ভুগছেন তারা আমাকে নক দিন। সাধ্যমতো উপকার করার চেষ্টা করব।’ নক দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জানলাম, তিনি এমএলএম বিজনেস করাবেন আমাকে দিয়ে। তাঁদের অফিস সোনারগাঁও হোটেলের বিপরীতে কোনো এক ভবনে। ডেসটিনি নেই কিন্তু বহাল তবিয়তে আছে ডেসটিনির উত্তরসূরিরা!
কোনো একজন শীর্ষ একটি দৈনিকে বিজ্ঞাপন দিয়েছেন— ‘স্পনসরশিপে লন্ডনে শিক্ষক নিবেন।’ বেকারত্বের কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ঢাকা থেকে সিলেটে তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য গেলাম। দেখা করে বুঝলাম—তিনি নিজেই অভাবে আছেন, লন্ডনে যাননি কোনোদিন, অথচ আরেকজনকে স্পনসরশিপে লন্ডনে নেওয়ার নামে বিজ্ঞাপন দিয়েছেন পত্রিকায়!
বেকার তরুণদের সঙ্গে এভাবেই চলছে দায়িত্বহীনদের দায়িত্বহীনতা ও প্রতারকদের প্রতারণা। প্রতারকদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঝে মাঝে গ্রেপ্তার করলেও, দায়িত্বজ্ঞানহীনদের মনে হয় আইনের কোনো আওতায় আনা যায় না। তাই প্রতারকরা কিছুটা ভয়ে থাকলেও দায়িত্বজ্ঞানহীন মানুষগুলো একদম বেপরোয়া। সমাজে চলে মাথা উঁচু করে। কিছু কিছু ইন্টারভিউ বোর্ডে তো এমন সব সদস্য থাকেন, যাঁরা তরুণ ইন্টারভিউদাতাকে কারণ ছাড়াই ধমকাতে থাকেন। কেমন আচরণ এসব!
বেকার তরুণদের সঙ্গে বন্ধ হোক এসব প্রতারণা, দায়িত্বজ্ঞানহীন ও অশোভনীয় আচরণ। চাকরি সবাইকে দেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু শিক্ষিত তরুণদের শিক্ষার মূল্য দেওয়া সম্ভব। আশা করি, আমাদের চাকরিদাতারা তরুণদের শিক্ষার মূল্য অন্তত দেবেন। কখনোই তাদেরকে কোনো কিছুতে ঝুলিয়ে রাখবেন না। মনে রাখবেন, ‘অপেক্ষা মৃত্যুর চেয়েও কঠিন।’
ঢাকা