অস্থির হয়ে উঠেছে ভোজ্য তেলের বাজার। গত এক মাস ধরেই নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটির দাম বাড়ছে। সর্বশেষ গত দুই দিনের ব্যবধানে ভোজ্য তেলভেদে প্রতি লিটারে ৩ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশও ভোজ্য তেলের দাম বাড়ার বিষয়টি তাদের দৈনন্দিন খুচরা বাজারদরের প্রতিবেদনে (টিসিবি) তুলে ধরেছে। এছাড়া চাল ও আদার দামও বেড়েছে। হঠাত্ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ায় বিপাকে পড়েছে স্বল্প আয়ের মানুষ। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর নিউমার্কেট ও শান্তিনগর কাঁচাবাজারে সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দামের এ তথ্য পাওয়া যায়। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বিশ্বে ভোজ্য তেলের বড় উত্পাদনকারী দেশ ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও আর্জেন্টিনা রপ্তানি কমিয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের দাম বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারে। গতকাল রাজধানীর খুচরাবাজারে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল ১০৫ থেকে ১০৮ টাকা, পামঅয়েল ৯১ থেকে ৯২ টাকা ও পামসুপার ৯৪ থেকে ৯৬ টাকায় বিক্রি হয়। এছাড়া নতুন দর অনুযায়ী প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিনের দাম ১১৫ থেকে ১২০ টাকা ও ৫ লিটারের বোতল ৫৭০ থেকে ৬০০ টাকা বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
টিসিবির প্রতিবেদনের তথ্য মতে, গত এক বছরে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেলের দাম ২৪ শতাংশ, পামঅয়েল ৩৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ, পামসুপার ৩১ শতাংশ, বোতলজাত সয়াবিনে ১২ শতাংশ বেড়েছে। তবে ভোজ্য তেলের নতুন দর অনুযায়ী দাম বৃদ্ধির এই হার আরো বেশি।
মৌলভীবাজারের পাইকারি ভোজ্য তেল ব্যবসায়ী মো. আলী ভুট্টো গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম গত ছয় মাস ধরেই বাড়তি। ফলে দেশের বাজারেও দাম বাড়ছে। তিনি বলেন, চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন সয়াবিন তেলের গড় দাম ছিল ৭০৭ ডলার। যা নভেম্বরে এসে দাঁড়িয়েছে ৯৭৪ ডলারে। একই ভাবে দেশের বাজারে গত জুনে প্রতি মণ সয়াবিন তেল ৩ হাজার টাকা, পামঅয়েল ২ হাজার ৩০০ টাকা ও পামসুপার ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে প্রতি মণ সয়াবিন ৩ হাজার ৮২০ টাকা, পামঅয়েল ৩ হাজার ৩৮০ টাকা ও পামসুপার ৩ হাজার ৪৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একদিকে যেমন ভোজ্য তেলের বড় উত্পাদক দেশগুলো রপ্তানি কমিয়েছে অন্যদিকে করোনা সংকটের কারণে চীন এবার প্রচুর পরিমাণে ভোজ্য তেল কিনেছে। ফলে ভোজ্য তেলের বাজারে এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। দেশের বাজারে সহসাই ভোজ্য তেলের দাম কমার সম্ভাবনা নেই বলে তিনি জানান।
বেড়েছে চাল, আদার দাম
ভোজ্য তেলের পাশাপাশি বাজারে চাল ও আদার দামও বেড়েছে। আমনের ভরা মৌসুমের এ সময়ে কেন চালের দাম বাড়ছে এর কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না ভোক্তারা। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে মানভেদে প্রতি কেজি চালে ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গতকাল বাজারে সরু চাল নাজিরশাইল/মিনিকেট মানভেদে ৫৬ থেকে ৬০ টাকা, মাঝারিমানের চাল পাইজাম/লতা ৪৮ থেকে ৫৫ টাকা ও মোটা চাল ইরি/স্বর্ণা ৪৪ থেকে ৪৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। কিন্তু গত সপ্তাহে নাজিরশাইল/মিনিকেট মানভেদে ৫৫ থেকে ৫৮ টাকা, মাঝারিমানের চাল পাইজাম/লতা ৪৬ থেকে ৫২ টাকা ও মোটা চাল ইরি/স্বর্ণা ৪৩ থেকে ৪৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়।
শান্তিনগর বাজারের চাল ব্যবসায়ী হেলালউদ্দিন বলেন, মোকামে সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। তিনি বলেন, এবার বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে আমনের ফলন ভালো না হওয়ায় ধানের দাম বেশি। ধানের দাম বেশি হওয়ায় চালের দামও বেড়েছে।
কমেছে সবজি, ডাল, আটা,
ময়দা ও পেঁয়াজের দাম
বাজারে এখন প্রায় প্রতিদিনই বাড়ছে শীতকালীন সবজির সরবরাহ। ফলে এর সুফল পেতে শুরু করেছে ভোক্তারা। দাম কমছে সবজির। গতকাল বাজারে প্রতি কেজি শিম ২৫ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। আকারভেদে প্রতিটি ফুলকপি ও বাঁধাকপি বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে। এছাড়া অন্যান্য সবজির মধ্যে মুলা ২০ থেকে ২৫ টাকা, কাঁচা টম্যাটো ২৫ থেকে ৩০ টাকা, ঢ্যাঁড়শ, পটোল, শালগম ৪০ থেকে ৫০ টাকা, বরবটি ৫০ থেকে ৬০ টাকা, বেগুন ৪০ থেকে ৫০ টাকা, করল্লা ৪০ থেকে ৫০ টাকা, ঝিঙা ৩০ থেকে ৪০ টাকা, কচুর লতি ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া প্রতি কেজি গাজর ৬০ থেকে ৭০ টাকা, পুরোনো আলু ৪০ টাকা ও নতুন আলু ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজিতে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
গত সপ্তাহে কাঁচা মরিচের কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হলেও গতকাল তা ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। এছাড়া দেশি শুকনা মরিচের দাম কেজিতে ১০ টাকা কমে ২৪০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হয়।
এদিকে পেঁয়াজের দাম আরো কমেছে। দেশি পুরনো পেঁয়াজ মানভেদে কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা কমে গতকাল খুচরা বাজারে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা ও আমদানিকৃত পেঁয়াজ ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া নতুন পাতাযুক্ত পেঁয়াজ এক আঁটি (এক কেজি পরিমাণ) ৪০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
সবজির পাশাপাশি দাম কমেছে মসুর ডাল ও আটা, ময়দার। বড়দানা মসুর ডাল কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা কমে ৬৫ থেকে ৭০ টাকা, মাঝারি ও ছোট দানা মসুর ডাল কেজিতে ১০ টাকা কমে যথাক্রমে ৮০ থেকে ৯০ টাকা ও ১০০ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।