রোহিঙ্গা স্থানান্তরকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা না করার আহ্বান সরকারের

কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর নিয়ে সরকারের প্রকৃত প্রচেষ্টাকে দুর্বল বা ভুলভাবে ব্যাখ্যা না করার জন্য সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে আহ্বান জানানো হয়েছে। গতকাল শুক্রবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানানো হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কক্সবাজারের জনাকীর্ণ ক্যাম্পগুলোতে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ এবং ভূমিধসসহ যে কোনো দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এই কারণে সরকার জরুরিভাবে ভাসানচরের অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরিকল্পনা করে। দ্বীপটির উন্নয়নে সরকার ৩৫ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে। পর্যায়ক্রমে ১ লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শুক্রবার প্রথম পর্যায়ে ১ হাজার ৬০০র বেশি রোহিঙ্গার প্রথম দলটি স্বেচ্ছায় ভাসানচরে গেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১৩ হাজার একরের ভাসানচরে বছরব্যাপী মিঠা পানি, চমত্কার হ্রদ ও যথাযথ অবকাঠামো ও আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুত্ ও পানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, কৃষি জমি, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, দুটি হাসপাতাল, চারটি কমিউনিটি ক্লিনিক, মসজিদ, গুদাম, টেলিযোগাযোগ পরিষেবা, থানা, বিনোদন ও শিক্ষাকেন্দ্র, খেলার মাঠ ইত্যাদি রয়েছে। এখানকার ক্যাম্প কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোর অস্থায়ী কাঠামোগুলোর মতো নয়, ভাসানচরের আবাসনটি কংক্রিট দিয়ে নির্মাণ করা, যা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়েও অক্ষত থাকবে। শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আম্পানেও ভাসানচরের অবকাঠামো সুরক্ষিত ছিল।

বাংলাদেশ সরকার ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য উপযুক্ত স্যানিটেশন এবং চিকিত্সাসুবিধার পাশাপাশি পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করেছে। এখানে উপযুক্ত হাসপাতাল, পর্যাপ্ত কোভিড টেস্টিং এবং চিকিত্সার সুবিধা রয়েছে। সরকারি সংস্থা ছাড়াও স্থানান্তরিত রোহিঙ্গাদের জন্য সম্ভাব্য সব সহায়তার জন্য প্রায় ২২টি এনজিও রয়েছে। নারী পুলিশসহ পুলিশ সদস্য মোতায়েনের মাধ্যমে দ্বীপে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং এলাকাটি পুরোপুরি সিসি ক্যামেরার আওতায় রয়েছে।

তাদের স্থানান্তরের বিষয়ে সরকারের অবস্থান প্রথম থেকেই খুব স্পষ্ট ও স্বচ্ছ। যারা আগ্রহী তাদেরই সেখানে স্থানান্তর করা হবে। বেশ কয়েকটি রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদল ভাসানচরের সুবিধাগুলো দেখতে গিয়েছেন। এছাড়া কয়েকটি এনজিও ও সাংবাদিকরাও দ্বীপটি পরিদর্শন করেছেন। সবাই ভাসানচরের সুবিধাগুলো নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। এখনো সাংবাদিকদের একটি দল ভাসানচরে রয়েছে। এছাড়াও স্থানান্তরের আগে বিভিন্ন অংশীজনদের পরামর্শ নেওয়া হয়েছে। সরকার আশা করে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘ খুব শিগিগরই এই প্রক্রিয়াতে যুক্ত হবে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর হলো বৃহত্তর প্রত্যাবাসন পরিকল্পনার অংশ, যা বাংলাদেশ সরকারের মূল অগ্রাধিকার। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক এবং তাদের অবশ্যই নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে। বর্তমান অবস্থায় জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর জন্য মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে অর্থপূর্ণভাবে কাজ করতে হবে। এই প্রত্যাবাসনের মাধ্যমেই রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান হতে পারে। মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের অনকূল পরিবেশ তৈরিতে মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে কাজ করার জন্য সরকার আহ্বান জানিয়েছে।

রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরে প্রধানমন্ত্রীকে

ধন্যবাদ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর

এদিকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর করার ‘বিচক্ষণ ও দৃঢ়’ পদক্ষেপ নেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শুক্রবার ধন্যবাদ জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। ভাসানচরে সফলভাবে রোহিঙ্গাদের প্রথম ব্যাচ স্থানান্তরের পর তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ‘বিশ্ব নেতৃত্ব ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলো মিয়ানমারের নিপীড়িত জনগণের জন্য কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নিলেও তারা বারবার বিবৃতি দিচ্ছে। তারা শুধু প্রতিশ্রুতিই দিয়ে যাচ্ছে। তাদের (রোহিঙ্গা) স্থানান্তর বা তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে কেউই এগিয়ে আসেনি।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কুতুপালংয়ের উপচেপড়া জনাকীর্ণ পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিধস এবং অন্যান্য অপ্রীতিকর ঘটনার ফলে মৃত্যু ও দুর্ঘটনা এড়াতে এবং আরো উন্নত জীবনমানের ব্যবস্থা করতে পর্যায়ক্রমে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর করা হচ্ছে। তাছাড়া সেখানে (কুতুপালং) মাদক ব্যবসার প্রসার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিও ঘটছে।

ড. মোমেন বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থা রোহিঙ্গা শিবির বা ভাসানচরের সুবিধা নিয়ে উচ্চস্বরে কথা বলছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে মিয়ানমারের কাছে যাওয়ার সাহস বা আন্তরিকতা কারও নেই। তিনি বলেন, যত দ্রুত সম্ভব বিশ্বের সমস্ত আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোকে এই সঙ্কট সমাধানের জন্য অর্থবহ উপায়ে মিয়ানমারের কাছে যাওয়ার জন্য নিজেদের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করতে হবে।